বরিশাল জার্নাল ডেস্ক
কুমিল্লায় ধর্ষণের পর হত্যার শিকার স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিন (১৫) কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে উঠেছিলেন ‘রাজুর স্ত্রী’ পরিচয়ে। হোটেলের রেজিস্টারে তার নাম লেখা হয়েছিল ‘তানজু আক্তার’ এবং বয়স উল্লেখ করা হয়েছিল ১৮ বছর। গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর সঙ্গে হোটেলটির ৩০২ নম্বর কক্ষে ওঠেন তিনি। পরদিন ৭ অক্টোবর হোটেল ছেড়ে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হন তাজমিন। তবে বাড়ি ফেরার পথে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. সুমন মিয়ার হাতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হন তিনি। তাজমিনের শেষ যাত্রাপথ ঘিরে অনুসন্ধানে সামনে এসেছে একের পর এক নতুন তথ্য।
অনুসন্ধান ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে চাকরি করেন রাজু। ফেসবুকে পরিচয়ের আগে ইনস্টাগ্রামেও তাদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল বলে জানা গেছে। নিয়মিত বার্তা আদান-প্রদানের পাশাপাশি তারা পরস্পরকে রিলসও পাঠাতেন। তাজমিনের কক্সবাজার যাওয়া, সেখানে অবস্থান এবং বাড়ি ফেরার বাসের টিকিট কাটার বিষয়ে একাধিক তথ্য সামনে এসেছে। তবে রাজুর সঙ্গে তাজমিনের পরিচয় ও কক্সবাজার যাত্রার বিষয়টি একদিকে, আর হত্যাকাণ্ডে কারা জড়িত, তা অন্যদিকে। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, এ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. সুমন মিয়া (৩৫)। তাকে গ্রেপ্তারের পর আদালতে হাজির করা হলে তিনি হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।
তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় তাজমিন ও রাজু কলাতলীর একটি আবাসিক হোটেলের ৩০২ নম্বর কক্ষে ওঠেন। পরদিন ৭ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে হোটেল ছেড়ে যাওয়ার পর রিয়াজ তাজমিনকে কুমিল্লাগামী বাসে তুলে দেন বলে জানা গেছে। কক্সবাজারে তাজমিনের অবস্থানের বিষয়টি হোটেলের রেজিস্টার খাতা, সিসিটিভি ফুটেজ এবং রিয়াজের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
গত ৭ অক্টোবর বাড়ি ফেরার পথে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়ার হাতে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তাজমিন। পরদিন সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার ভোরালজগপুর উত্তরপাড়া গ্রামের একটি ধানখেতের আইল থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় করা হত্যা মামলায় সিএনজিচালক সুমন মিয়াকে (৩৫) চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের আইফোনটি উদ্ধার করে পুলিশ।
কক্সবাজারের কলাতলীতে কুটুমবাড়ি-সংলগ্ন সড়কের শেষ মাথায় অবস্থিত তিনতলা আবাসিক হোটেলটির রেজিস্টারের তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর সঙ্গে স্ত্রী পরিচয়ে ৩০২ নম্বর কক্ষ ভাড়া নেন তাজমিন। রেজিস্টারে তাঁর নাম লেখা হয় ‘তানজু আক্তার’ এবং বয়স উল্লেখ করা হয় ১৮ বছর। সেখানে রিয়াজের পরিচয় দেওয়া হয়েছে বান্দরবানের লামা এলাকার মনির আহমদের ছেলে হিসেবে।
হোটেলটির এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এক রাত থাকার পর ৭ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে তারা হোটেল ছেড়ে চলে যান। হোটেলের রেজিস্টারে রিয়াজের দুটি মুঠোফোন নম্বর ও একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নম্বর লেখা রয়েছে। এর মধ্যে একটি নম্বর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজুর এক সহকর্মী জানান, তিনি ও রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজু সহকর্মী। তাজমিন হত্যাকাণ্ডের পর রিয়াজ তাঁর কাছে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন এবং তাকে বাঁচানোর জন্য আকুতি-মিনতি করেন। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও দাবি করেন রিয়াজ।
ওই সহকর্মী বলেন, ফেসবুকের মাধ্যমে ১৭ দিন আগে তাজমিনের সঙ্গে রিয়াজের প্রথম পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। এরপর তাজমিন সেখানে এসে ঘোরাফেরা করে আবার চলে যান। এ ঘটনার আগে রিয়াজ ‘আইকনিক এক্সপ্রেস’ বাসের টিকিট কেটে তাজমিনকে বাসে তুলে দেন। রিয়াজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাজমিনের বাসের টিকিটের দাম ছিল ৯০০ টাকা। এসব ঘটনার পর রিয়াজ আপাতত হোটেল ছেড়ে ছুটিতে আছেন বলে জানান ওই সহকর্মী।
অন্যদিকে, রিয়াজের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের দাবি, প্রায় পাঁচ মাস আগে তাজমিনের সঙ্গে রিয়াজের প্রথম পরিচয় হয়। এরপর থেকে তাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।
কক্সবাজারের কক্সেস প্যানোরামিক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর এজেন্সির আবদুল্লাহ গণমাধ্যমকে জানান, মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাত ৮টার পর তাজমিন ও রাজু তাদের কাউন্টারে গিয়ে বাসের টিকিট কাটেন। পরদিন বুধবারের জন্য আইকনিক এক্সপ্রেসের একটি টিকিট বুক করেন রাজু। রাজুর ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাজমিনকে বাসে তুলে দেন তিনি। বাসটি দুপুরের দিকে কুমিল্লার উদ্দেশে কক্সবাজার ছেড়ে যায়।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত পৌনে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে আসা আইকনিক এক্সপ্রেসের বাস থেকে কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডের হোটেল নূরজাহানের সামনে নামেন তাজমিন। এরপর শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য তিনি একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করেন। কিন্তু সেই যাত্রা আর বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছায়নি।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অটোরিকশাচালক সুমন তাজমিনকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করেন। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করা হয়েছে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তাজমিন মাকে জানিয়েছিলেন, তিনি এক বান্ধবীর বাসায় যাচ্ছেন। তবে বান্ধবীর নাম ও তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইলে তাজমিন কিছু জানাননি। এর আগে তিনি প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যান। পরে কুমিল্লায় ফিরে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তাজমিনের মা কেয়া খাতুন সাংবাদিকদের জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়েছিল। তখন তাজমিন জানিয়েছিলেন, তিনি এক বান্ধবীর সঙ্গে আছেন। মেয়েকে বান্ধবীর বাড়ি থেকে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মেয়ে কার সঙ্গে আছেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাননি।
গত ৪ অক্টোবর এক বান্ধবীকে হাতঘড়ি দেওয়া নিয়ে মায়ের সঙ্গে তাজমিনের ঝগড়া হয়। এরপর তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক বান্ধবীর কাছে যান। সেখান থেকে মুঠোফোনে রিয়াজের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন রিয়াজ তাকে কক্সবাজারে আসার জন্য বিকাশের মাধ্যমে ৫০০ টাকা পাঠান।
এদিকে, রিয়াজের সহকর্মীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লায় ফেরার পথে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠার পরও রিয়াজের সঙ্গে তাজমিনের মুঠোফোনে কথা হচ্ছিল। অটোরিকশাচালকের বিস্তারিত তথ্যও তাজমিন রিয়াজকে জানিয়েছিলেন। তবে রাত দেড়টার দিকে তাজমিনের মুঠোফোনের লাইভ লোকেশন বন্ধ হয়ে গেলে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পরদিন বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে তাজমিনের ধর্ষণ ও হত্যার খবর দেখে স্তম্ভিত হয়ে পড়েন রিয়াজ।
ওই কর্মী আরও জানান, রিয়াজ গত তিন বছর ধরে কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে কর্মরত আছেন। ঘটনার পর থেকে রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর মুঠোফোন বন্ধ থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, মুঠোফোনের কললিস্টসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে তদন্ত চলছে। আসামি হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। তদন্ত শেষ হলে বাকি সবকিছু জানা যাবে।
তাজমিনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ জানান, মেয়েটি খুব চঞ্চল স্বভাবের ছিল। মা অসুস্থ হলে দুই যমজ ছোট ভাইয়ের দেখভাল করত সে। তার বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন এবং সকালে বাসা থেকে বের হয়ে রাতে ফিরতেন। তবে মেয়েকে বাবা খুব আদর করতেন। রাগ হলে তাজমিন কখনো কখনো হুটহাট বাসা থেকে বের হয়ে যেত বলেও জানান তিনি।
ডেইলি ক্যাম্পাস




