বরিশাল জার্নাল ডেস্ক
গত বছরের এপ্রিল থেকে চলতি এপ্রিল পর্যন্ত রাজধানীর ৫০ থানায় মোট ২০৩৮টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১২৮৮টির তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে আদালতে। কোনোটিরই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি পুলিশ।
তবে সবকিছু ছাপিয়ে এবার রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলায় দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ে চার্জশিট (তদন্ত প্রতিবেদন) দিয়েছে পুলিশ। মামলা দায়েরের পর মাত্র ছয় দিনের মাথায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক অহিদুজ্জামান আদালতে অভিযোগ পত্র জমা দেন। এতে সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ এবং স্বপ্নার বিরুদ্ধে ধর্ষণের পর মৃত্যুতে সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে।
এর আগে বাগেরহাটের মোংলায় এক শিশুকে ধর্ষণের অপরাধে আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। মামলা আদালতে আসার সাত কার্যদিবসের মধ্যে সেই রায় ঘোষণা করা হয়েছিল।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ইশরাত হাসান আগামীর সময়কে বলেছেন, আইনে আছে আসামি হাতেনাতে ধরা পড়লে ১৫ কার্যদিবস এবং আসামি হাতেহাতে ধরা না পড়লে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে৷ এক্ষেত্রে এত কম সময়ে রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলায় চার্জশিট ও ডিএনএ রিপোর্ট দেওয়াকে ইতিবাচকভাবে দেখছি।
দ্রুত সময়ে তদন্ত শেষ করলে অনেক গাফিলতি থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে মামলাটি সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে তদারকি করা হয়েছে। প্রত্যাশা করছি, কোনো ত্রুটি ছাড়াই অভিযোগপত্র জমা হয়েছে, যোগ করেন তিনি।
তিনি আরো যোগ করেন, যেসব ঘটনা মিডিয়াতে আসে না, তাদের ক্ষেত্রে কেন দ্রুত সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয় না? তাদের বিচার পাওয়ার জন্য কি রাস্তায় নামতে হবে? এটা তো তাদের সঙ্গে এক ধরনের অবিচার।
আইনে যা আছে : নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ধারা ১৮ অনুযায়ী, এই আইনে মামলার তদন্ত নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি হাতেনাতে গ্রেপ্তার হলে গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে পরবর্তী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে। হাতেনাতে গ্রেপ্তার না হলে, প্রাথমিক তথ্যপ্রাপ্তি বা তদন্তের আদেশ পাওয়ার তারিখ থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে। আগে অনেক ক্ষেত্রে তদন্তের জন্য ৩০ কার্যদিবস সময় ব্যবহৃত হতো। অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণার পর ধর্ষণের মামলাগুলোর তদন্ত ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
ধারা ১৮(২) অনুযায়ী, যুক্তিসংগত কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করা সম্ভব না হলে তদন্ত কর্মকর্তাকে সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই কেস ডায়েরিসহ বিলম্বের কারণ উল্লেখ করে ট্রাইব্যুনাল বা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে লিখিত প্রতিবেদন দিতে হবে। আদালত সন্তুষ্ট হলে অতিরিক্ত ১৫ কার্যদিবস সময় দিতে পারেন। ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হলে সময় আরও বাড়ানোর সুযোগও রয়েছে।
অন্যদিকে, তদন্ত কর্মকর্তা যদি বিলম্বের গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হন, তাহলে ধারা ১৮(৬) অনুযায়ী তা অদক্ষতা ও অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হতে পারে। এক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল বা ম্যাজিস্ট্রেট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করতে পারেন এবং বিষয়টি তার বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনেও লিপিবদ্ধ হতে পারে।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেছেন, আইনের মধ্য থেকেই দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ে রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। মামলাটি বিচারের মাধ্যমে আমরা একটা দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে চাই; যাতে কেউ এই ধরনের কাজ করতে সাহস না পায়। শুধু এই মামলা নয়, এ ধরনের সব মামলায় দ্রুত সময়ে তদন্ত শেষে নিষ্পত্তি করা হবে।
রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলায় নিযুক্ত বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলুর ভাষ্য,পুলিশের প্রবিধানের ২৬১(গ) অনুসারে যেকোনো জটিল মামলায় ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে। সেইক্ষেত্রে এই মামলায় আইন অনুযায়ী তদন্ত শেষে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। তবে অন্য মামলার ক্ষেত্রেও এটা চর্চা করা উচিত। তাহলে মানুষের আস্থা বাড়বে বিচার বিভাগের প্রতি৷
তিনি আরও উল্লেখ করেন, দুই আসামিকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগ পত্র জমা পড়েছে। দ্রুত সময়ে সাক্ষীদের আদালতে হাজির করে মামলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করা হবে৷ এর মাধ্যমে আসামিদের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ প্রমাণ করে সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করব।
গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা বাসা থেকে বের হলে আসামি সোহেল রানা কৌশলে ৫ম তলা বিল্ডিংয়ের তৃতীয় তলার একটি রুমে নিয়ে যায়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে আসামিদের রুমের সামনে রামিসার দেখতে পেয়ে ডাকাডাকি করে তার মা। সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার মা ফ্ল্যাটের অন্যদের নিয়ে এসে ভেতরে প্রবেশ করেন।
সোহেল ও স্বপ্নার শোয়ার রুমে রামিসার মাথাবিহীন দেহ এবং বালতির মধ্যে মাথা দেখতে পান। এ ঘটনার দিন শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা দুইজনকে আসামি করে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার প্রথমে স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন ২০ মে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। একইদিন আসামি সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত।
আগামীর সময়




