আসিফের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ

বরিশাল জার্নাল ডেস্ক

নিয়োগ-বদলির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মাসাতের অভিযোগ আগেই উঠেছিল আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে। তার সঙ্গে এখন যুক্ত হলো অর্থ পাচার।

অন্তর্বর্তী সরকারে প্রায় দেড় বছর উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনকালে অবৈধভাবে উপার্জিত ১১ হাজার কোটি টাকা তিনি বিদেশে পাচার করেছেন বলে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ জমা পড়েছে।

নিয়োগ বাণিজ্যের আগের অভিযোগের সঙ্গে অর্থ পাচারের এই অভিযোগও তদন্ত হচ্ছে বলে আজ রবিবার দুদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

দুদকের ভাষ্য, আসিফ মাহমুদ দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি টাকা, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি টাকা এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করেছেন বলে তারা অভিযোগ পেয়েছেন।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ অবশ্য দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

আজ খবরটি প্রকাশের পর তিনি এক ফেসবুক পোস্টে কটাক্ষ করে লিখেছেন, ‘অনুসন্ধানে বিদেশে কিছু পেলে আমাকে শুধু ১০% দিয়েন, চলতে কষ্ট হচ্ছে।’

পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, দুদকের এই পদক্ষেপ হয়রানিমূলক বলেই তিনি মনে করছেন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারে উপদেষ্টা ছিলেন। প্রথমে শূধূ যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং পরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করেন তিনি।

সংসদ নির্বাচনের আগে ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর উপদেষ্টার পদ ছেড়ে রাজনীতিতে নেমে এনসিপিতে যোগ দেন আসিফ। তিনি এখন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার মধ্যেই তাকে নিয়ে দুদক অনুসন্ধানে নামল।

গত ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ-পদোন্নতি বাণিজ্যর অভিযোগে আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। এজন্য গঠন করা হয় চার সদস্যের একটি অনুসন্ধা্ন দল।

এরপর আসিফ মাহমুদ গত ৯ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেছিলেন, দুর্নীতি অনুসন্ধান নয়, দুদকের উদ্দেশ্য আসলে তার চরিত্র হনন।

তার পাঁচদিনের মধ্যে তার বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগের তদন্তে নামার কথা জানাল দুদক। সংস্থাটি বলেছে, চলমান অনুসন্ধানের সঙ্গে নতুন অভিযোগও যুক্ত হবে।

১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ

দুদকে অভিযোগ এসেছে, আসিফ মাহমুদ দুর্নীতির অর্থে বিলাসবহুল জীবনযাপন ও বিদেশে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন।

অভিযোগে বলা হয়েছে, দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি টাকা, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি টাকা এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করেছেন। এই অর্থে তিনি সেখানে বাড়ি কিনেছেন, বিনিয়োগ করেছেন।

দুই ভগ্নিপতি ও ভাগ্নের মাধ্যমে তিনি বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে।

তার বিলাসি জীবনযাপন নিয়ে নিয়মিত হেলিকপ্টারে ভ্রমণ এবং পাঁচ তারকা হোটেলে অবস্থানের বিষয়টি তুলে ধরেছে দুদক।

নিয়োগ ও পদায়নে কোটি টাকা ঘুৃষের অভিযোগ

দুদকে করা অভিযোগে বলা হয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগের পর প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং সারা দেশে ৩৬ জন ডিসি পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে টেন্ডার বাণিজ্য ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকালে উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

প্রকল্প থেকে হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ

দুদকে অভিযোগ এসেছে, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার বাণিজ্যের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন আসিফ মাহমুদ।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগও এসেছে তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাত।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে কোটি কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগ জমা পড়েছে দুদকে।

এ ছাড়া ঘুষ নিয়ে এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানকে এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনে সিইও আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও এসেছে দুদকে।

এছাড়া গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে আসিফ মাহমুদের নিজের এলাকা কুমিল্লার মুরাদনগরে যে ৪৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, সেখান থেকে প্রভাব খাটিয়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আসিফের বিরুদ্ধে।

এ ছাড়া তার বাবা মাহমুদুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও ঘুষ লেনদেনের তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ দুদক পেয়েছে।

‘তারা দিতে থাকুক, আমরা প্রস্তুত’

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ এনসিপির ‘সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রম’ নিয়ে আজ বিকালে সংবাদ সম্মেলনে এলে আসিফ মাহমুদের কাছে অর্থ পাচারের অভিযোগের প্রতিক্রিয়া জানতে চান সাংবাদিকরা।

জবাবে তিনি বলেন, ‘টাকার অঙ্কটা আগে উনারা (দুদক) বসে সীদ্ধান্ত নিলে ভালো হতো। একবার শুনলাম, ১ লক্ষ ২০ হাজার কোটি টাকা। যেটি আমার দুই মন্ত্রণালয়ের বাজেটও ছিল না। আরেকবার শুনি ১১ হাজার কোটি। কিছুদিন আগে শুনেছিলাম ২ কোটি ৭৬ লাখ।’

এটি তাকে হয়রানির করার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার কথা জানিয়ে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘সরকার যদি কাউকে পাকড়াও করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে এটি করার অনেক পদ্ধতি আছে, যা বিগত সময়েও দেখেছি।’

দুদকের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ পাঁচ মাস পর পুনরায় দুদক গঠিত হলেও আওয়ামী লীগের সময়ের কোনো দূর্নীতি নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। কিছুদিন আগে তারা বিএনপির সময়ে হওয়া একটা পদোন্নতির জন্য আমার বিরুদ্ধে তদন্ত করলো। কিন্তু দেখলো সেটিতে কোনো কাজ হচ্ছে না। তাই এখন আরেকটি দিয়েছে, আগামীতে আরেকটি দেবে।’

‘তারা দিতে থাকুক, আমরা প্রস্তুত আছি,’ বলেন এনসিপির এই নেতা।

আগামীর সময়

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top