​চক-ডাস্টারের আলোয় আঁকা জীবন: প্রজ্ঞার বাতিঘর ও ভালোবাসার মেলবন্ধন

​জাহাঙ্গীর আলম হৃদয়

​শরতের স্নিগ্ধ বাতাস আর শুভ্র কাশফুলের বার্তা নিয়ে আবার ফিরে এসেছে ৫ই অক্টোবর—বিশ্ব শিক্ষক দিবস। ইউনেস্কোর আহ্বানে ১৯৯৪ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর এই দিনটি ঘটা করে পালিত হলেও, শিক্ষকের আসন কোনো নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষক তো সেই অবিনাশী প্রদীপ, যিনি নিজে ক্ষয় হয়ে অন্যকে আলোর পথ দেখান। তিনি পাঠ্যবইয়ের নীরস হরফ ছাপিয়ে এক একটি কোমল মনে এঁকে দেন জীবনের বিশাল ক্যানভাস, বুনে দেন প্রজ্ঞা ও মূল্যবোধের অজর বীজ।

​শিক্ষকতা তাই কোনো সাধারণ পেশা নয়; এ এক পরম তপস্যা, ভালোবাসার নিঃশব্দ মহাকাব্য। সেই মহাকাব্যের চরণে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে আজ আমার স্মৃতির পসরা সাজিয়েছি জীবনঘনিষ্ঠ কিছু অনন্য প্রতিচ্ছবি দিয়ে।

জীবনের ক্যানভাসে এক আত্মত্যাগী আলো: সহকারী শিক্ষিকা মোসা: মর্জিনা আক্তার

​শিক্ষকতার এই আত্মত্যাগী রূপটি আমি প্রতিদিন খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করি আমার নিজের আঙিনায়, আমার সহধর্মিণী মোসা: মর্জিনা আক্তারের মাঝে। তিনি পটুয়াখালী দক্ষিণ লেবুখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক।

​বিদ্যালয়ে তীব্র শিক্ষক সংকট। ছয়জন শিক্ষকের বিপরীতে দুইজন অবসর নিয়েছেন এবং একজন আছেন দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণে। মাত্র তিনজন শিক্ষকের ওপর ভর করে চলছে পুরো স্কুলের কয়েকশো শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ও প্রশাসনিক কাজের গুরুভার। এই অসম লড়াইয়ে তিনি নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন নিঃশেষে।

​তীব্র ব্যাক পেইন আর নিউরোমেডিসিনের জটিল শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে ডাক্তার যখন তাঁকে কঠোর ‘বেড রেস্ট’-এর নির্দেশ দিয়েছেন, তখনও তাঁর মন পড়ে থেকেছে ক্লাসরুমের চেনা চক-ডাস্টার আর নিষ্পাপ শিশুগুলোর মাঝে। ডাক্তারের বারণ ও তীব্র যন্ত্রণাকে উপেক্ষা করে তিনি ছুটে গেছেন প্রিয় বিদ্যাপীঠে।

অবশেষে শরীরের অপারগতায় ১০ দিনের চিকিৎসাজনিত ছুটি নিতে বাধ্য হলেও, তাঁর এই অদম্য দায়িত্ববোধ প্রমাণ করে—শিক্ষকতার আলো কতটা গভীর হলে মানুষ নিজের কষ্টকেও ভুলে যেতে পারে।

​”বিদ্যাপীঠের ওই ছোট ছোট মুখগুলোর দিকে তাকালে জীবনের সব যন্ত্রণা যেন এক নিমেষে উবে যায়। একজন শিক্ষকের কাছে প্রতিটি শিশুই একেকটি আগামীর ভবিষ্যৎ—তাদের গড়ে তোলার চেয়ে বড় কোনো আনন্দ এই পৃথিবীতে নেই।”
— মোসা: মর্জিনা আক্তার, সহকারী শিক্ষক, দক্ষিণ লেবুখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

​স্মৃতির প্রাঙ্গণে শৈশবের প্রথাবিরোধী ও নিবেদিতপ্রাণ গুরুজন

​আজকের এই আলো ঝলমলে দিনে স্মৃতির পাতা উল্টালে মন ছোঁয় শৈশবের সেই কাঁচা মাটির প্রাঙ্গণ। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যে শিক্ষকদের হাত ধরে আমার শিক্ষার সূচনা হয়েছিল, পরম করুণাময়ের ডাকে তাঁরা আজ সবাই ওপারে পাড়ি জমিয়েছেন। পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করি তাঁদের বিদেহী আত্মাকে।

​মনে পড়ে আমাদের শৈশবের ক্রীড়াপ্রেমী সেই প্রিয় শিক্ষককে। যিনি কখনো শাসন করতেন না, কিংবা শিক্ষার্থীদের গায়ে হাত তুলতেন না; বরং ভালোবাসার বন্ধনে জড়িয়ে রাখতেন। পুরো পটুয়াখালী জেলায় হাডুডু খেলার প্রখ্যাত রেফারি হিসেবে যাঁর জোরালো ডাক ছিল। মজার ছলে তাঁর বলা সেই প্রবাদসম মুখস্থ ছড়াটি আজও কান পাতলে শুনি— “মাইরের নাম লক্ষীকান্ত, ভুত পালায় যার ডরে।”

​আরও মনে পড়ে পরম আদর্শবান ব্যক্তিত্ব আমাদের প্রিয় ‘হুজুর স্যার’ আব্দুল জব্বার মৌলভী-কে, যাঁর নীতি-নৈতিকতার দীক্ষা আজও আমার অন্তরে প্রদীপ হয়ে জ্বলে।

​প্রাথমিক শিক্ষার অঙ্গনে আজও যাঁরা নীরবে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে দুমকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: মনিরুল ইসলাম স্যার অন্যতম। তিনি একজন দূরদর্শী শিক্ষক নেতা, যিনি স্নেহের হাসিতে শিক্ষার্থীদের জয় করেন এবং শিক্ষকের অধিকার রক্ষায় চিরকাল অগ্রগামী। একই সাথে দেবীরচর দুমকি মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কে. এম. জামাল আহম্মদ স্যারের কথা না বললেই নয়—যাঁকে বলা যায় দুম‌কি উপজেলার আইসিটি ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার এক অনন্য দিশারী।

​জ্ঞানালোকের দীপ্ত প্রদীপ: মাধ্যমিক থেকে স্নাতকোত্তর

​মাধ্যমিক স্তরে দীর্ঘ স্মৃতি না থাকলেও অন্তরের গভীর থেকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি ধর্মীয় শিক্ষার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মাওলানা খলিলুর রহমান স্যারকে।
​উচ্চ মাধ্যমিকের সোনালী দিনগুলোতে যে গুণীজনদের সান্নিধ্যে মানসিকভাবে বিকশিত হয়েছিলাম—ইসলাম শিক্ষা বিভাগের কায়সারী স্যার, সমাজকর্ম বিভাগের মইনুল ইসলাম স্যার ও আবুল বাশার স্যার, এবং কৃষি বিভাগের মোহাম্মদ হারুনুর রশিদ স্যার—তাঁদের স্নেহ ও প্রজ্ঞা আজও আমার স্মৃতিমুকুরে অমলিন।
​আর উচ্চতর শিক্ষার (স্নাতক ও স্নাতকোত্তর) অঙ্গনে যাঁদের আদর্শ আমার চিন্তার জগতকে সমৃদ্ধ করেছে, তাঁরা হলেন শিক্ষা জগতের দুই মহীরুহ:
​অধ্যাপক আব্দুস সবুর হাওলাদার: বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের সমাজকর্ম বিভাগের সাবেক সুযোগ্য বিভাগীয় প্রধান। যাঁর ধ্রুপদী প্রজ্ঞা, স্নেহশীল আচরণ এবং মানবীয় শিক্ষাই আমার চলার পথের আসল পাথেয়।

​প্রফেসর এ. টি. এম. রাশেদুল ইসলাম: সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের সাবেক উপাধ্যক্ষ (ভাইস প্রিন্সিপাল) এবং বর্তমানে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের  চেয়ারম্যান। এক অনুকরণীয় দিকপাল, যিনি শুধু জ্ঞান বিতরণ করেননি, শিখিয়েছেন কীভাবে মাথা উঁচু করে আদর্শের সাথে বাঁচতে হয়।

নিভৃত আলোর কারিগরদের দুঃখ-দুর্দশা ও প্রত্যাশা
​আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার এক বিরাট অংশজুড়ে রয়েছেন অসংখ্য নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক, যাঁদের ঘামে ও শ্রমে দাঁড়িয়ে আছে প্রান্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, ডিগ্রি কিংবা অনার্স চালু থাকা অসংখ্য বেসরকারি স্কুল-কলেজের নন-এমপিও শিক্ষকেরা আজও মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বছরের পর বছর ধরে বিনা বেতনে বা সামান্য সম্মানীতে আলো ছড়িয়েও তাঁরা বঞ্চনার শিকার। তাঁদের এই অসীম দুর্ভোগ লাঘবে রাষ্ট্র ও সমাজের অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

​একইভাবে গভীর শ্রদ্ধা ও শুভকামনা জানাই কিতাবিয়া মাদ্রাসা, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, নূরানী ও হিফজ মাদ্রাসাসহ সকল প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের প্রতি। পরিবার ও সমাজের নৈতিক বুনিয়াদ তৈরিতে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। নন-এমপিও শিক্ষকদের বঞ্চনা নিরসন এবং সকল শ্রেণির বেসরকারি শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নে একটি যুগোপযোগী ও স্থায়ী নীতিমালার রূপরেখা বাস্তবায়ন করা সময়ের অন্যতম দাবি।

শেষ কথা
​শিক্ষকেরা হলেন সেই স্থপতি, যাঁরা কোনো কোলাহল ছাড়াই একটি জাতির অদৃশ্য বুনিয়াদ তৈরি করেন। দক্ষিণ লেবুখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মোসা: মর্জিনা আক্তার, দুমকি এলাকার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম ও কে. এম. জামাল আহম্মদের মতো শিক্ষকেরা যেমন তৃণমূলের প্রান্তিক শিশুদের জীবনের আলো দেখাচ্ছেন; তেমনই অধ্যাপক আব্দুস সবুর হাওলাদার কিংবা প্রফেসর এ. টি. এম. রাশেদুল ইসলামের মতো প্রাজ্ঞ শিক্ষাবিদেরা আমাদের দেখিয়েছেন মহীরুহের মতো দাঁড়িয়ে থাকার শিক্ষা।

​বিশ্ব শিক্ষক দিবসে পৃথিবী থেকে সকল শিক্ষকের আত্মার চিরশান্তি প্রার্থনা করি এবং সরকারি-বেসরকারি, এমপিও কিংবা নন-এমপিও—সকল স্তরের জীবিত শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্য কামনা করি। আমার পরম শ্রদ্ধেয় গুরুজনদের এবং আমার প্রিয় সহধর্মিণী ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক মোসা: মর্জিনা আক্তারকে জানাই শিক্ষক দিবসের অন্তহীন শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও রক্তিম শুভেচ্ছা। আপনারা আছেন বলেই আমাদের আগামী পথচলা আজও এতটা আলোকময়!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top