২৬ বছর পর সাপের খামারের স্বীকৃতি পেলেন পটুয়াখালীর রাজ্জাক

বরিশাল জার্নাল ডেস্ক

সাধারণ মানুষের কাছে সাপ মানেই ভয় আর আঁতকে ওঠার গল্প। অথচ সেই বিষধর প্রাণীদের নিয়েই পটুয়াখালীতে গড়ে উঠেছে এক সম্ভাবনাময় ও ব্যতিক্রমী শিল্প। পটুয়াখালী সদর উপজেলার নন্দীপাড়া এলাকার বিশ্বাসবাড়ির প্রবেশদ্বারে স্থাপিত হয়েছে ‘বাংলাদেশ স্নেক ভেনম এম’ নামের একটি বিশেষ সাপের খামার। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সাপের বিষ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের স্বপ্ন নিয়ে ২৬ বছর লড়াই করার পর সম্প্রতি চূড়ান্ত সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে খামারটি। এতে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির পাশাপাশি সমৃদ্ধ হবে দেশের ওষুধ শিল্প— এমন প্রত্যাশা প্রাণিসম্পদ বিভাগের।

খামারে ঢুকতেই চোখে পড়ল সারি সারি খাঁচা। সেখানেই খুব যত্নে লালনপালন করা হচ্ছে বিষধরসহ বিভিন্ন প্রজাতির তিন শতাধিক সাপ। এর মধ্যে রয়েছে রাজগোখরা (কিং কোবরা), কালাচ, কালো গোখরা, খৈয়া গোখরা, পাইথন ও দাঁড়াশসহ নানা প্রজাতি। খামারটি বর্তমানে শুধু বিষ সংগ্রহের কেন্দ্রই নয়; স্থানীয়ভাবে একটি মিনি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেও বেশ পরিচিত। প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে উৎসুক মানুষ এখানে ভিড় জমাচ্ছেন। খলিসাখালী এলাকা থেকে এসেছে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবু তাহা। বলল, ‘খুবই ভালো লেগেছে, এতগুলো সাপ দেখতে পেয়ে। সাপের সঙ্গে ডিমও দেখলাম। মনে হচ্ছে, আমি চিড়িয়াখানায় আছি। আমাদের এলাকার লোকজন আগে এসেছিল এখানে; তাদের কাছে শুনে আজকে আসলাম।’

বরিশাল থেকে আসা মো. হুমায়ুন নামের একজন বললেন, ফেসবুকে দেখেছি, এখানে সাপের খামার আছে। তারপর আজকে কুয়াকাটা যাব, তাই পথে গাড়ি নিয়ে আসলাম খামার দেখতে। খামারে না এলে বিশ্বাসই করতাম না, এত পদ আছে সাপের। অন্ততপক্ষে ১০-১৫ প্রজাতির সাপ দেখেছি। জীবনে প্রথম সাপের ডিম দেখলাম। আবার সেই ডিমকে আগলে রেখে তা দিচ্ছে সাপ। এটা সরাসরি যে না দেখবে, সে বিশ্বাসই করতে পারবে না।

এই উদ্যোগের পেছনের কারিগর, এক সময়ের সৌদিপ্রবাসী আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস জানিয়েছেন, সৌদি আরব থেকে যখন দেশে ফিরি, তখন বাড়ির তরুণ ছেলেরা ভেবেছিল, আমি হয়তো তাদের জন্য দামি উপহার নিয়ে এসেছি। কিন্তু আমি তাদের বলেছিলাম, আমি কোনো উপহার আনিনি, বরং এমন এক নতুন প্রকল্পের ধারণা নিয়ে এসেছি, যার মাধ্যমে অসংখ্য বেকার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। তারা অবাক হয়ে জানতে চাইল সেটা কী? আমি উত্তর দিয়েছিলাম— সাপ সংরক্ষণ!

ক্যালেন্ডার অ্যাপ বাছুন

রাজ্জাক বিশ্বাস এই উদ্যোগের শুরুর চমকপ্রদ এক গল্প বললেন। ‘২০০০ সালের প্রথম দিকে ছয় মাসের ছুটি শেষে প্রবাসে ফিরে যাওয়ার আগে নন্দীপাড়ায় আমার খালাবাড়িতে দাওয়াতে যাই। সেখানে একটি পরিত্যক্ত ঘর দেখে আমি বললাম, ‘এর ভেতরে সাপ আছে।’ আমার কথা শুনে সবাই হেসে উঠে বলেছিল, ‘আপনি তো আসলে পাগল হয়ে যাচ্ছেন! যেখানেই যান, সেখানেই সাপ দেখতে পান!’ কিন্তু আমার ধারণা ভুল ছিল না। আমি একটি লাঠি দিয়ে আঘাত করতেই ঘর থেকে একটি সাপ বের হয়ে আবার ভেতরে ঢুকে গেল। এরপর ঘরটির মাটি খুঁড়ে আমরা একটি সাপ ও ২৪টি ডিম উদ্ধার করি। পরে সেই ডিম ও সাপ নিয়েই মূলত শুরু হয়েছিল আমাদের এই স্বপ্নের যাত্রা।’

তিনি বলছিলেন, ‘এরপর টানা কয়েক বছর একের পর এক প্রজাতি নিয়ে গবেষণা করি। এক একটি প্রজাতির স্বভাব ও বিষের ধরন আলাদা হওয়ায় এদের নিয়ে মাস জুড়ে গবেষণা চালাতে হতো। কিছু সাপের ক্ষেত্রে গবেষণা করে ব্যর্থও হয়েছি, পরে সেগুলোকে আর বাড়াইনি। বর্তমানে আমাদের খামারে আড়াইশর বেশি পূর্ণাঙ্গ সাপ, বাচ্চাসহ তিন শতাধিক সাপ রয়েছে। খামারের খাঁচার ভেতরে এখন সাপ ডিম দিচ্ছে এবং বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেই ডিম থেকে বাচ্চা ফুটানো হচ্ছে।

‘তবে এই যাত্রা পুরোপুরি মসৃণ নয়। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার আদেশ ও গেজেটের শর্ত সাপেক্ষে আমাদের সাপের খামারটি অন্য একটি উপযুক্ত স্থানে স্থানান্তরের প্রস্তাব রয়েছে। কিন্তু মারাত্মক আর্থিক সংকট এবং টানা বৃষ্টিপাতের কারণে খামারটি স্থানান্তর করতে পারছি না’— যোগ করেন তিনি।

‘সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি আমাকে সামান্য সহায়তা করে এবং ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পাই, তবে সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠে সম্ভাবনাময় প্রকল্পটিকে দ্রুত আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে’— জানালেন রাজ্জাক বিশ্বাস।

খামারটি নিয়ে স্থানীয়দের ভালোবাসাও এখন চোখে পড়ার মতো। আশপাশের কোনো এলাকায় সাপের খবর পেলেই খামারের কর্মচারীরা ছুটে যান উদ্ধারকাজে। সেখান থেকে সাপ ধরে এনে খামারে লালনপালন করা হয়। এই উদ্যোগকে ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দারা অত্যন্ত গর্বিত। গোলাম রসুল নামের এক প্রতিবেশী বললেন, জেলার বাইরে থেকেও যদি কেউ সাপের সন্ধান জানায়, দ্রুত সেখানে ছুটে যায় রাজ্জাক বিশ্বাস। তার কারণে আমাদের এলাকারও পরিচিতি বেড়ে গেছে। দূরে কোথাও গেলে সবাই বলে, ‘সাপের এলাকার লোক আসছে।’ ভালোই লাগে শুনতে।

পটুয়াখালী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তার ব্যতিক্রমী সাপের খামারটি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে সম্প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধন লাভ করেছে। বর্তমানে তার খামারে বিরল ও বিষধর প্রজাতির তিন শতাধিক সাপ রয়েছে।

তিনি বললেন, ‘সাপের খামারটি মূল বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য অর্থাৎ বিষ বা ভেনম সংগ্রহের জন্যই গড়ে তোলা হচ্ছে। আমার বিশ্বাস, ভেনম উৎপাদনে সক্ষম পূর্ণাঙ্গ সাপের খামার হিসেবে এটিই বাংলাদেশে প্রথম।’

সরকারি এই কর্মকর্তার দাবি, রাজ্জাক বিশ্বাসের এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন চিকিৎসা ও ওষুধ শিল্পে সাপের বিষের দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ হবে, অন্যদিকে নতুন নতুন তরুণ উদ্যোক্তা তৈরিতে বিশাল ভূমিকা রাখবে।

আগামীর সময়

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top