জাহাঙ্গীর আলম হৃদয়
যে খাল একসময় মানুষ অবলীলায় পার হতো, কালের বিবর্তনে তা আজ এক প্রমত্তা ও হিংস্র নদীতে রূপ নিয়েছে। পটুয়াখালী জেলার দুমকী উপজেলার ৫ নং ওয়ার্ডের কার্তিকপাশা এলাকায় কঁচাবুনিয়া-ভারানী খালের পশ্চিম পাড়ে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ ভাঙন। এতে বিলীন হতে বসেছে এলাকার একমাত্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কার্তিকপাশা বায়তুস সালাম সোনালী জামে মসজিদ, সংলগ্ন ঈদগাহ মাঠ, গ্রামীণ রাস্তাঘাট এবং শত শত পরিবারের শেষ সম্বল বসতভিটা।
পটুয়াখালী সদর উপজেলা থেকে উৎপত্তি হলেও দুমকী উপজেলার লেবুখালী ইউনিয়নের কার্তিকপাশা অংশেই এই নদী ও খালের ভাঙন রূপ নিয়েছে সবচেয়ে ভয়ংকর। খালের এই অংশে মারাত্মক ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষ, যার স্থায়ী সমাধানের দাবিতে সম্প্রতি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর লিখিত আবেদন জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
১৫০ মিটার এলাকা চরম ঝুঁকিতে, হুমকিতে মসজিদ-ঈদগাহ
অফিশিয়াল নথি অনুযায়ী, পায়রা নদীর সংযুক্ত কার্তিকপাশা ৫নং ওয়ার্ডের পাঙ্গাশিয়া সীমানা থেকে ভারানী খালের রাস্তার আইডি নং- (৫৭৮৯৬৪১২৮) থেকে কার্তিকপাশা বায়তুস সালাম সোনালী জামে মসজিদ ও ঈদগাহ মাঠ পর্যন্ত প্রায় ১৫০ মিটার এলাকা এখন মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

মসজিদের মুসল্লি ও এলাকাবাসীর পক্ষে আবেদনকারী মোঃ ফোরকান আলী (দফাদার) জানান, দীর্ঘদিন ধরে দুই পাড়ের ভাঙন অব্যাহত থাকায় একের পর এক কৃষিজমি ও বসতবাড়ি খালের পেটে চলে যাচ্ছে। দ্রুত এই ১৫০ মিটার এলাকায় গাইড ওয়াল বা পাইলিং না করা হলে এলাকার প্রধান বায়তুস সালাম সোনালী জামে মসজিদ, ঈদগাহ মাঠের সংযোগ সড়ক এবং আশেপাশের বসতঘরগুলো সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাবে।
বর্ষায় জলাবদ্ধতা ও ডায়রিয়া ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
খালের তীরবর্তী সড়ক ধসে পড়ায় লেবুখালী ও কার্তিকপাশা এলাকার মানুষের স্বাভাবিক চলাচল চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বর্ষাকালে খালের উপচে পড়া পানি বসতবাড়িতে ঢুকে পড়ে এবং পুরো এলাকা প্লাবিত হয়। এতে গবাদিপশু লালন-পালন বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি কৃষি জমি তলিয়ে বিঘ্নিত হচ্ছে ফসল উৎপাদন।
সবচেয়ে বিপাকে পড়েছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। কাদা-পানি পেরিয়ে তারা ঠিকমতো স্কুল-মাদ্রাসায় যেতে পারছে না। এছাড়া বসতবাড়ির শৌচাগার বা টয়লেটগুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগ, যা বর্তমানে সার্বিক জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভাঙনের নেপথ্যে মূল কারণ ও প্রবীণের স্মৃতি
প্রবীণদের মতে, এককালের এই ছোট খাল বা নদীটি এতটা চওড়া ছিল না। এলাকার ৭০ বছর বয়সী এক প্রবীণ স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বলেন, ছোটবেলায় আমরা এই পাড় থেকে ওই পাড়ে এক লাফে পার হয়ে যেতাম। আর আজ আমার ৪০-৪৫ বছর বয়সী সন্তানও এই নদীতে নামতে ভয় পায়!
ভাঙন তীব্র হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ লেবুখালীতে পায়রা সেতু (লেবুখালী সেতু) হওয়ার পর মূল নদীর তীব্র স্রোতের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে এই খালের দিকে প্রবেশ করছে। এছাড়া প্রতিদিন অসংখ্য ভারী কার্গো জাহাজ, ট্রলার ও দ্রুতগতির স্পিডবোট চলাচলের ফলে সৃষ্ট ঢেউ প্রতিনিয়ত দুই পাড় ধসিয়ে দিচ্ছে।
জোড়াতালির কাজ নয়, টেকসই পাইলিংয়ের দাবি
স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বারবার অবহিত করা সত্ত্বেও দীর্ঘ স্থায়ী কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। প্রতিবছর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সাময়িকভাবে রাস্তার ভেতরের অংশ থেকে মাটি কেটে ধসে যাওয়া পাড় জোড়াতালি দেওয়া হয়। কিন্তু সেই কাটা মাটির গর্তেই পানি জমে জলাবদ্ধতা আরও বাড়ে। ইটের যেসব বাঁধ অতীতে ছিল, তাও আজ খালের পেটে।
এলাকাবাসীর পক্ষে থেকে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে আকুল আবেদন জানানো হয়েছে যেন অবিলম্বে ভারানী খালের পশ্চিম পাড়ে কার্তিকপাশা ৫ নং ওয়ার্ডে কমপক্ষে ১৫০ মিটার স্থায়ী পাইলিং বা সিসি ব্লক স্থাপন করে দুর্যোগ দূরীকরণে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।




