ভোলা প্রতিনিধি
ভোলায় জেলা প্রশাসনের ইজারা দেওয়া বালুমহালের আড়ালে মেঘনা নদীতে বেপরোয়া বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, নিয়মনীতি উপেক্ষা করে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন ও বিক্রি করা হচ্ছে। এতে একদিকে জেলা শহর রক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে মেঘনার বুকে জেগে ওঠা প্রায় ২০ বছরের পুরোনো চরও বিলীন হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিনের বালু বাণিজ্যের কোটি কোটি টাকা বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগবাঁটোয়ারা হয়।
বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে স্থানীয়দের বিক্ষোভ, মানববন্ধন এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর মেঘনার ইলিশা পয়েন্টের ৪ নম্বর বালুমহালে অভিযান চালায় প্রশাসন। এসি ল্যান্ড এএসএম মসিউর রহমানের নেতৃত্বে কোস্ট গার্ডের একটি দল অভিযানে অংশ নেয়। তবে অভিযানে কাউকে আটক করা যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযানের খবর আগেই বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের কাছে পৌঁছে যায়। পরে নদীতে থাকা ড্রেজার ও বাল্কহেড দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়। একপর্যায়ে নদী ফাঁকা করে কমপক্ষে অর্ধশতাধিক বাল্কহেড নদীর পাড়ের কাছে অবস্থান নেয়।
প্রশাসনের দাবি, এসব বাল্কহেড বৈধ ইজারাদারদের এবং যান্ত্রিক মেরামতের জন্য পাড়ে রাখা হয়েছিল। তবে অন্তত ১২টি বাল্কহেডের শ্রমিকদের দাবি, নদীতে বালু উত্তোলনের সময় প্রশাসনের অভিযানের খবর পেয়ে তাদের দ্রুত সরে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়।
প্রশাসনের কর্মকর্তা ও বাল্কহেড শ্রমিকদের এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলার চারটি বালুমহালে নির্ধারিত সংখ্যক ড্রেজার থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে সেখানে শতাধিক ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। বালুমহালের নির্ধারিত সীমানা ও নিয়মনীতি না মেনেই বালু উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে। তবে প্রশাসনের কর্মকর্তারা অভিযানে তেমন কোনো অনিয়ম চোখে পড়েনি বলে দাবি করেছেন।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করেই প্রতিদিন কোটি টাকার বালু বাণিজ্য চলছে। দিনের বালু বিক্রির টাকা রাতে ভাগবাঁটোয়ারা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বেপরোয়া বালু উত্তোলনের কারণে জেলা শহরের বিভিন্ন পয়েন্ট এখন তীব্র ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে। ইতোমধ্যে কাচিয়ার মাঝের চর, মদনপুর চর ও বৈরাঙ্গার চরসহ অন্তত ছয়টি চর বিলীন হওয়ার পথে। এসব চরে প্রায় ১৫ হাজার কৃষক চাষাবাদ করতেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
বালুমহাল বন্ধের দাবিতে জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসককে উকিল নোটিশও দিয়েছেন হাইকোর্টের একজন আইনজীবী। দক্ষিণাঞ্চলীয় নাগরিক আন্দোলনের সভাপতি মোবাশ্বের উল্লাহ চৌধুরী বলেন, নিয়মনীতি না মেনে বালু উত্তোলন বন্ধের নির্দেশ থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।
ভোলার সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত মাহাবুব মোর্শেদ বাবুল বলেন, এভাবে বালু উত্তোলন চলতে থাকলে একসময় ভোলার অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে। বদলে যেতে পারে জেলার মানচিত্র।
কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের সভাপতি শাহাবুদ্দিন ফরাজি ও নেতা হাসান কেরানী বলেন, বালু উত্তোলনের কারণে কৃষকরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন। চর ও কৃষিজমি রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
জামায়াতে ইসলামীর জেলা নায়েবে আমির অধ্যক্ষ মো. নজরুল ইসলাম বলেন, নদীভাঙন রোধে সরকার প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। নিয়মবহির্ভূতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে সিসি ব্লক বাঁধেও ধস দেখা দিয়েছে। ভোলা রক্ষায় বালুমহাল বন্ধ করা জরুরি।
জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান বলেন, বালুমহালে কেউ নিয়মনীতি উপেক্ষা করে বালু উত্তোলন করছে কিনা, তা তদারকিতে মোবাইল টিম গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে আমাদের টিম কয়েক দফা মেঘনা নদীতে অভিযান পরিচালনা করেছে। নির্ধারিত ড্রেজারের বাইরে অন্য কোনো এলাকা থেকে কেউ এসে বালু তুলছে কিনা, তা যাচাইয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বেও অভিযান শুরু হয়েছে।
ভোলাকে নদীভাঙনের হাত থেকে রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।।




