জাহাঙ্গীর আলম হৃদয়
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক মঞ্চগুলোর একটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়, জাতীয় স্বার্থ ও বৈশ্বিক অঙ্গনে দেশের অবস্থান তুলে ধরতে এই মঞ্চে বহু রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান বক্তব্য দিয়েছেন। সেই দীর্ঘ ইতিহাসে একটি পরিবারের তিন সদস্যের উপস্থিতি তৈরি করেছে একটি বিশেষ রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা।
১৯৮০ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাষণ দিয়ে যে অধ্যায়ের সূচনা, ১৯৯৩ সালে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে তা নতুন মাত্রা পায়। চার দশকের বেশি সময় পর, ২০২৬ সালে একই আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বক্তব্য দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান। ফলে জাতিসংঘের মঞ্চে এটি একই পরিবারের তিন সদস্যের অংশগ্রহণ—দুই প্রজন্মজুড়ে বিস্তৃত একটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক সংযোগ।
জিয়াউর রহমান
১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনের তৃতীয় প্লেনারি সভায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ভাষণ দেন। তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বয়স এক দশকও পূর্ণ হয়নি। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, দারিদ্র্য, ক্ষুধা, বেকারত্ব এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে উন্নত বিশ্বের অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল আন্তর্জাতিক আলোচনার অন্যতম বড় বিষয়।
জিয়াউর রহমান তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের উন্নয়ন-চ্যালেঞ্জ, স্বনির্ভরতার প্রয়োজনীয়তা, কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য মোকাবিলার বিষয় তুলে ধরেন। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা, শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দেন।
বিশ্বের ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর বৈষম্য কমানো, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং একটি ন্যায়সংগত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথাও তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পায়।
সদ্য স্বাধীন একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের বাস্তবতা তুলে ধরার সেই উপস্থিতি দেশের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হয়ে আছে।
খালেদা জিয়ার কণ্ঠে বাংলাদেশ
এর ১৩ বছর পর, ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘের ৪৮তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।
তাঁর প্রথম ভাষণে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও উন্নয়নের সম্পর্ক, দারিদ্র্য মোকাবিলা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, ছোট রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও অধিকার এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক গুরুত্ব পায়।
বাংলাদেশের অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, বিশেষ করে গঙ্গার পানির প্রশ্নও তাঁর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পায়। একই সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষা, প্রযুক্তির ব্যবধান, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, শরণার্থী সমস্যা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো বিষয়ও উঠে আসে।
পরবর্তী সময়েও জাতিসংঘের বিভিন্ন সাধারণ পরিষদীয় কার্যক্রমে তাঁর অংশগ্রহণ অব্যাহত থাকে। ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন অধিবেশন ও বিশেষ কার্যক্রমে তাঁর বক্তব্য বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্বের ধারাবাহিকতায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নেয়।
চার দশক পেরিয়ে নতুন অধ্যায়
এবার সেই ধারাবাহিকতায় যুক্ত হচ্ছে নতুন একটি নাম—তারেক রহমান।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে তাঁর প্রথম ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে।
একই পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে তাঁর এই উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্বের ধারাতেও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের জন্য আরও একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তারেক রহমানের সম্ভাব্য বক্তব্যে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, ভবিষ্যৎ উন্নয়ন অগ্রাধিকার, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, দারিদ্র্য বিমোচন, জলবায়ু অর্থায়ন এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে।
বিশ্বরাজনীতিতে পরিবারের এমন নজির
একই পরিবারের একাধিক সদস্য বা প্রজন্মের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে আসা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার ঘটনা বিশ্বরাজনীতিতে একেবারে অজানা নয়। বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এর একাধিক দৃষ্টান্ত রয়েছে।
ভারতের নেহরু-গান্ধী পরিবার এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণগুলোর একটি। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, তাঁর কন্যা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং ইন্দিরার পুত্র প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী—তিন প্রজন্মের এই পরিবারের তিন নেতা ভারতের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
পাকিস্তানের ভুট্টো পরিবারেও রয়েছে অনুরূপ দৃষ্টান্ত। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং তাঁর কন্যা বেনজীর ভুট্টো—দুজনই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘের মঞ্চে পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে শরিফ পরিবারেও রয়েছে পারিবারিক নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত। নওয়াজ শরিফ ও তাঁর ছোট ভাই শাহবাজ শরিফ—দুজনই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বুশ পরিবারে রয়েছে দুই প্রজন্মের দুই প্রেসিডেন্টের নজির। জর্জ এইচ. ডব্লিউ. বুশ এবং তাঁর পুত্র জর্জ ডব্লিউ. বুশ—দুজনই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে জাতিসংঘের মঞ্চে বক্তব্য দিয়েছেন।
কানাডার ট্রুডো পরিবারেও রয়েছে দুই প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী পিয়েরে ট্রুডো এবং তাঁর পুত্র জাস্টিন ট্রুডো—দুজনই কানাডার সরকারপ্রধান হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
এশিয়ার বাইরে আফ্রিকার কেনিয়াট্টা পরিবারেও রয়েছে এমন রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের উদাহরণ। কেনিয়ার স্বাধীনতার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নেতা জোমো কেনিয়াট্টার পর তাঁর পুত্র উহুরু কেনিয়াট্টা দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতৃত্ব দেন।
ফিলিপাইনের রাজনৈতিক ইতিহাসেও রয়েছে একাধিক পরিবারের এমন নজির। মারকোস পরিবারে ফার্দিনান্দ মার্কোস সিনিয়র ও তাঁর পুত্র ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে এসেছেন। একইভাবে আকুইনো পরিবারে কোরাজন আকুইনো ও তাঁর পুত্র বেনিগনো আকুইনো তৃতীয় ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেশটির আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
আর আজারবাইজানের আলিয়েভ পরিবারে হেইদার আলিয়েভের পর তাঁর পুত্র ইলহাম আলিয়েভ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির প্রতিনিধিত্ব করেন।
এসব উদাহরণ দেখায়, বিশ্বরাজনীতিতে রাজনৈতিক পরিবারের একাধিক প্রজন্মের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে আসা নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, ইতিহাস ও পারিবারিক উত্তরাধিকার আলাদা। ফলে এসব ঘটনাকে একই মাপকাঠিতে বিচার না করে নিজ নিজ জাতীয় প্রেক্ষাপটে দেখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জিয়া পরিবারের ঘটনাটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—একই পরিবারের দুই প্রজন্মের তিন সদস্য রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে থেকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন বা করতে যাচ্ছেন।
লেখক : বিশেষ প্রতিনিধি, বরিশাল জার্নাল




