বরিশাল জার্নাল ডেস্ক
আজ শুক্রবার বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাঁচ দিনের সরকারি সফর শেষে প্রকাশিত বাংলাদেশ-চীনের যৌথ ঘোষণাপত্রে এসব তথ্য জানানো হয়।
যৌথ ঘোষণাপত্রে বলা হয়, চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২২ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত সরকারি সফরে চীন যান। সফরকালে তিনি দালিয়ানে অনুষ্ঠিত নিউ চ্যাম্পিয়ন্স ২০২৬-এর ১৭তম বার্ষিক সভা (সামার দাভোস)-এও অংশ নেন।
চীন চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় অভিনন্দন জানিয়েছে। একই সঙ্গে নতুন সরকারের শাসন কার্যক্রমের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে ‘বাংলাদেশ বিফোর অল’ নীতির প্রশংসা করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ মনে করে, চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য নতুন উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
দুই দেশ উচ্চপর্যায়ের সফর ও রাজনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে। পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা বিনিময়, সরকার, আইনসভা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ আরো বাড়ানো হবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে নিয়মিত কৌশলগত সংলাপ চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক ‘২+২ সংলাপ’ চালুর সম্ভাবনা যাচাই করবে দুই দেশ।
‘এক চীন’ নীতিতে বাংলাদেশের পুনর্ব্যক্ত সমর্থন
যৌথ ঘোষণাপত্রে দুই দেশ একে অপরের মৌলিক জাতীয় স্বার্থ ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়ে দৃঢ় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
বাংলাদেশ আবারও ‘এক চীন’ নীতির প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। এতে বলা হয়, পৃথিবীতে একটিই চীন, তাইওয়ান গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বেইজিংই সমগ্র চীনের একমাত্র বৈধ সরকার। বাংলাদেশ যেকোনো ধরনের ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতা’ প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেছে এবং জাতীয় পুনঃএকত্রীকরণে চীনা সরকারের প্রচেষ্টার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং বাংলাদেশের জনগণের নিজস্ব বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়নপথ বেছে নেওয়ার অধিকারকে সম্মান জানিয়েছে।
বেল্ট অ্যান্ড রোড ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা
দুই দেশ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর আওতায় উচ্চমানের সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চীন বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করে বড় অবকাঠামো প্রকল্পের পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক ক্ষুদ্র প্রকল্প বাস্তবায়নেও সহযোগিতা করবে।
চীন বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকায়ন, কৃষির সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নে সক্ষমতা অনুযায়ী সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। বাণিজ্য, ই-কমার্স, শিল্প, সরবরাহ ব্যবস্থা ও বিনিয়োগে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতেও দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করবে।
বাংলাদেশের জন্য শতভাগ পণ্যে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা অব্যাহত রাখায় চীনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ঢাকা।
দুই দেশ যৌথভাবে মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংযোগ ব্যবস্থা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তি, দুর্যোগ প্রতিরোধ, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে একমত হয়েছে দুই দেশ।
এছাড়া বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাসহ আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির নতুন নতুন সুযোগ খুঁজে দেখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তিস্তা প্রকল্পে চীনের সহায়তা
যৌথ ঘোষণাপত্রে তিস্তা নদীকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দুই দেশ সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, পানি পরিকল্পনা, জলবিদ্যাগত পূর্বাভাস, বন্যা প্রতিরোধ, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, নদী খনন এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিনিময়ে সহযোগিতা আরো গভীর করবে।
চীন তার সক্ষমতা অনুযায়ী তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি) সহায়তা করবে। পাশাপাশি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দ্রুত শেষ করতে দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের কাজ এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করবে। সামুদ্রিক বিষয়েও সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
প্রতিরক্ষা খাতে সফর, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়সহ সহযোগিতা আরো সম্প্রসারণে একমত হয়েছে দুই দেশ। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমেও পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সম্পৃক্ততা বজায় রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
২০২৫ সালে বাংলাদেশ-চীন কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি এবং ‘পিপল-টু-পিপল এক্সচেঞ্জ ইয়ার’ সফলভাবে উদযাপনের প্রশংসা করেছে দুই দেশ।
গণমাধ্যম, থিংক ট্যাংক, শিক্ষা, চলচ্চিত্র, প্রকাশনা, যুব, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিতে সহযোগিতা আরও বাড়ানো হবে। মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করা হবে।
চীন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ অব্যাহত রাখবে। জনস্বাস্থ্য ও ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা ক্ষেত্রেও বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা বাড়ানো হবে। ইউনান প্রদেশসহ স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবায় চীনের সহযোগিতার প্রশংসা করেছে বাংলাদেশ।
ব্রিকস ও এসসিওতে বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন
বাংলাদেশ প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের ‘মানবজাতির অভিন্ন ভবিষ্যতের কমিউনিটি’ ধারণা এবং তাঁর প্রস্তাবিত বিভিন্ন বৈশ্বিক উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এবং এসব উদ্যোগে সহযোগিতা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
চীন জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের আরও সক্রিয় ভূমিকার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। পাশাপাশি ব্রিকসে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) অংশীদার হওয়ার আবেদনের প্রতিও সমর্থন দিয়েছে।
দুই দেশ আঞ্চলিক বহুপাক্ষিক সহযোগিতা আরও এগিয়ে নেওয়া এবং এ প্রক্রিয়ায় অঞ্চলের আরও দেশকে সম্পৃক্ত করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
দুই দেশ জাতিসংঘকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা এবং জাতিসংঘ সনদের উদ্দেশ্য ও নীতির প্রতি দৃঢ় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
এছাড়া সমতা ও শৃঙ্খলাভিত্তিক বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ের ফলাফল সমুন্নত রাখা এবং ফ্যাসিবাদ ও সামরিকবাদের পুনরুত্থানের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতার কথাও যৌথ ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। কায়রো ঘোষণা, পটসডাম ঘোষণা এবং জাতিসংঘ সনদভিত্তিক যুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতিও সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে দুই দেশ।
রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকার প্রশংসা করেছে চীন।
চীন জানিয়েছে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করতে তারা সহায়ক ভূমিকা অব্যাহত রাখবে।
সফরকালে উন্নয়ন সহযোগিতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কৃষি, শিক্ষা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতে একাধিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
সফরের শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের সরকার ও জনগণের আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ জানান এবং পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
কালের কণ্ঠ




