বরিশাল জার্নাল ডেস্ক
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নেপথ্যের পরিকল্পনা, আন্দোলনের কৌশল, সমন্বয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়কারী ও ডাকসু ভিপি আবু সাদিক কায়েম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমজাদ হোসেন হৃদয়
প্রশ্ন: জুলাই গণঅভ্যুত্থান কীভাবে গড়ে ওঠে?
সাদিক কায়েম: জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; এটি ছিল সময়ের অনিবার্য পরিণতি। আমরা মনে করতাম, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা শাসনব্যবস্থার অবসান স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সম্ভব নয়। ২০২৩ সাল থেকেই বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলোচনা শুরু করি। পরিকল্পনা ছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহবাগকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে গণআন্দোলনে পরিণত করার। ৫ জুন কোটা পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত সে সুযোগ তৈরি করে।
প্রশ্ন: জুলাই আন্দোলনে ছাত্রশিবিরের ভূমিকা কী ছিল?
সাদিক কায়েম: ছাত্রশিবির শুধু অংশগ্রহণ করেনি, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমন্বয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছে। বলা যায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কন্ট্রোলরুম ছিল ছাত্রশিবির। আন্দোলনের কর্মসূচি নির্ধারণ, সারা দেশে সমন্বয়, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তা ছড়িয়ে দেওয়া এবং সংকটময় সময়ে নেতৃত্ব ধরে রাখার কাজ করেছে। ১৮ জুলাইয়ের পর ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও প্রথম সারির সমন্বয়কদের ডিবিতে নেওয়ার পরও সিবগাতুল্লাহ, এস এম ফরহাদ, জাহিদুল ইসলামসহ আমাদের একটি টিম আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। এক দফা, অসহযোগ ও ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির পরিকল্পনায়ও আমাদের সম্পৃক্ততা ছিল।
প্রশ্ন: এত ভূমিকা থাকার পরও ছাত্রশিবির প্রকাশ্যে আসেনি কেন?
সাদিক কায়েম: দলীয় পরিচয় সামনে এলে সরকার সহজেই এটিকে ‘শিবিরের আন্দোলন’ বলে প্রচার করত এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হতো। তাই সচেতনভাবেই আমরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের প্ল্যাটফর্মকে সামনে রেখেছি।
প্রশ্ন: আপনাকেও সালমান নামে ছদ্মনাম ব্যবহার করতে দেখা গেছে। এর কারণ কী?
সাদিক কায়েম: সমন্বয়কদের কাছে আমার পরিচয় গোপন ছিল না। তারা আমাকে ব্যক্তি সাদিক কায়েম এবং ঢাবি শিবিরের সভাপতি হিসেবেই চিনত। কিন্তু ২৬ জুলাইয়ের পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। প্রথম সারির সমন্বয়কদের ডিবিতে নেওয়া হয়, দ্বিতীয় সারির সমন্বয়কদেরও খুঁজছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সেই সময় আমাকে দেশি-বিদেশি সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, কূটনীতিকসহ অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়েছে।
নিরাপত্তার স্বার্থে এবং কৌশলগত কারণে আমি সালমান নামে যোগাযোগ করতাম। কারণ আমি জানতাম না, যার সঙ্গে কথা বলছি তিনি কতটা নিরাপদ। তখন আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল আন্দোলনকে সচল রাখা। সেই লক্ষ্য পূরণে যে কৌশল প্রয়োজন ছিল, আমি সেটিই অনুসরণ করেছি।
প্রশ্ন: বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ও ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের পর আন্দোলন কীভাবে চলেছে?
সাদিক কায়েম: সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করতে পারে— এমন ধারণা আগে থেকেই ছিল। তাই বিকল্প পরিকল্পনা প্রস্তুত ছিল। শুধু কোটা নয়, পুরো শাসনব্যবস্থাকে রাজনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জ করার চিন্তা থেকেই নয় দফার খসড়া তৈরি করা হয়। ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেটি অনলাইনে পাঠানো সম্ভব হয়নি। পরে অফলাইনে সমন্বয় করে ৯ দফা চূড়ান্ত করা হয়।
প্রশ্ন : ৯ দফার বিষয়ে যদি বিস্তারিত বলতেন…
সাদিক কায়েম : ১৮ জুলাই সন্ধ্যার আগেই আমরা বুঝে গিয়েছিলাম, আন্দোলন আর কোটার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
আমি আসিফ মাহমুদের সঙ্গে আলোচনা করেছিলাম এমন কিছু দাবি দিতে হবে, যা শেখ হাসিনার ক্ষমতার কাঠামোকেই চ্যালেঞ্জ করবে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের সাবেক সভাপতি, কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল এবং আন্দোলনের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়ক মিলে আমরা ৯ দফার খসড়া তৈরি করি। পরে সেটি সমন্বয়ক আব্দুল কাদেরের নামে মিডিয়ায় পাঠানো হয়। ৯দফার প্রতিটি দাবি এমনভাবে সাজানো হয়েছিল, যাতে সরকার একটি দাবি মানলেও পরবর্তী দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক অবস্থায় পড়ে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল—শেখ হাসিনাকে ছাত্র হত্যার দায় স্বীকার করে জাতির কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে। আমাদের লক্ষ্য ছিল শুধু দাবি বাড়ানো নয়; আন্দোলনকে এমন একটি রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিয়ে যাওয়া, যেখান থেকে সরকার সহজে বের হতে না পারে।
প্রশ্ন: কিন্তু ইন্টারনেট বন্ধ অবস্থায় এই ৯ দফা দেশবাসীর কাছে পৌঁছাল কীভাবে?
সাদিক কায়েম: এটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন কাজ। আগে হলে একটি মেসেজ দিলেই হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেত। কিন্তু তখন কোনো অনলাইন মাধ্যমই কাজ করছিল না। আমরা ৯ দফা চূড়ান্ত করার পর সেটি প্রিন্ট করি। ভিডিও বার্তা রেকর্ড করি। পেনড্রাইভে কপি করি।
এরপর সাংবাদিকদের হাতে হাতে পৌঁছে দিই। অনেক সাংবাদিক শাহবাগ পর্যন্ত আসতেই পারছিলেন না, কারণ পথে ছাত্রলীগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধা ছিল।
তবুও আমরা ঝুঁকি নিয়ে তাদের কাছে নথিগুলো পৌঁছে দিই। দেশীয় গণমাধ্যমে যদি প্রকাশ না হয়, সেজন্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কাছেও পাঠানো হয়। এএফপি, আলজাজিরাসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মাধ্যমে তথ্য পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। আমাদের আরেকটি টিম শহীদ, আহত ও গণহত্যার তথ্য সংগ্রহ করে রাজশাহী সীমান্ত দিয়ে বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। বিশ্ব যেন জানতে পারে—বাংলাদেশে কী ঘটছে।
প্রশ্ন: প্রথম সারির সমন্বয়কদের ডিবিতে নেওয়ার পর আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ কীভাবে ধরে রেখেছিলেন?
সাদিক কায়েম: সেটিই ছিল সবচেয়ে সংকটময় সময়। আমরা দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির নেতৃত্ব প্রস্তুত রাখি এবং নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিই। প্রতিদিন নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়, যাতে মানুষ বুঝতে পারে নেতৃত্বকে আটক করা গেলেও আন্দোলন থেমে যায়নি। প্রয়োজন হলে তৃতীয় সারির নেতৃত্ব দায়িত্ব নেবে— এমন প্রস্তুতিও ছিল।
প্রশ্ন: ডিবি হেফাজতে সমন্বয়কদের দিয়ে আন্দোলন স্থগিত করার ঘোষণা দেওয়ানোর পর অনেকেই মনে করেছিলেন আন্দোলন শেষ। সেই অবস্থায় আপনাদের ভূমিকা কী ছিল?
সাদিক কায়েম: ২৮ জুলাই ছিল পুরো আন্দোলনের সবচেয়ে সংকটপূর্ণ দিনগুলোর একটি। ডিবি হেফাজতে থাকা সমন্বয়কদের দিয়ে ঘোষণা করানো হয় যে, আন্দোলন স্থগিত করা হয়েছে। সরকারের উদ্দেশ্য ছিল একটাই—মানুষকে বিশ্বাস করানো যে আন্দোলনের আর কোনো নেতৃত্ব নেই, আর কোনো কর্মসূচিও হবে না।
এই ঘোষণার পর অনেকের মধ্যেই হতাশা তৈরি হয়। বিভিন্ন জেলায় শোনা যাচ্ছিল, সমন্বয়করা নাকি আপস করে ফেলেছেন। কেউ কেউ বলছিলেন, আন্দোলন এখানেই শেষ। কিন্তু আমরা তখনই সিদ্ধান্ত নিই—যদি প্রথম সারির নেতৃত্ব কোনো কারণে কার্যকর না থাকে, তাহলে দ্বিতীয় সারি সামনে আসবে। দ্বিতীয় সারিও যদি না পারে, তাহলে তৃতীয় সারির নেতৃত্ব আন্দোলন চালাবে। কোনো অবস্থাতেই আন্দোলন থামানো যাবে না। আমি তখন মাহিন সরকার, রিফাত রশীদ, আব্দুল কাদের, হান্নান মাসুদদের সঙ্গে আলাপ করি। আমি তাদের স্পষ্ট বলেছিলাম, তোমরা যদি কোনো কারণে আন্দোলন চালাতে না পারো, তাহলে আমরা তৃতীয় স্তরের নেতৃত্ব নিয়ে আন্দোলন চালাব। এখান থেকে পেছনে ফেরার আর কোনো সুযোগ নেই। আমাদের কাছে তখন একটি বিষয় পরিষ্কার ছিল—এই আন্দোলন আর কোটার নয়, এটি শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলন।
প্রশ্ন: আন্দোলন কীভাবে এক দফার দিকে গেল?
সাদিক কায়েম: ১৫ জুলাইয়ের হামলা, ১৬ জুলাইয়ের শহীদ হওয়া এবং ১৮ জুলাইয়ের গণহত্যার পর আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়, এটি আর শুধু কোটা সংস্কারের আন্দোলন নয়। এত রক্তের পর শেখ হাসিনার পদত্যাগ ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক সমাধান নেই। তাই ধাপে ধাপে নয় দফা, অসহযোগ এবং শেষ পর্যন্ত এক দফার আন্দোলনের দিকে যাওয়া হয়।
প্রশ্ন: ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির পরিকল্পনা কীভাবে হয়েছিল?
সাদিক কায়েম: প্রথমে ৬ আগস্ট কর্মসূচির চিন্তা ছিল। পরে আমরা সিদ্ধান্তে আসি, সময় নষ্ট করলে সরকার আবার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে। তাই কর্মসূচি এগিয়ে আনার প্রস্তাব দিই। পাশাপাশি গণভবন ঘিরে মানুষের অবস্থান, প্রবেশপথ ও দায়িত্ব বণ্টনের বিস্তারিত পরিকল্পনাও আগেই প্রস্তুত করা হয়েছিল।
প্রশ্ন: জুলাই আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
সাদিক কায়েম: এই বিপ্লবের ইতিহাস লিখতে গেলে নারীদের ভূমিকা আলাদা করে উল্লেখ করতেই হবে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তারা সাহসিকতার সঙ্গে রাজপথে ছিলেন। অনেক ক্ষেত্রে ছেলেদের সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে তারা আন্দোলনকে রক্ষা করেছেন। ১৫ জুলাইয়ের হামলার সময় এবং পরবর্তী দিনগুলোতে নারী শিক্ষার্থীরা যেভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, সেটি আন্দোলনের গতিপথই বদলে দিয়েছে। তাদের রক্তাক্ত ছবি, আহত হওয়ার দৃশ্য সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করে। ইন্টারনেট বন্ধ ও কারফিউ জারির সময়ও অনেক মা, বোন, নারী শিক্ষার্থী হিজাব-নিকাব পরে রাজপথে নেমেছেন। অনেক মা তাদের সন্তানদের নিয়ে প্রতিবাদে অংশ নিয়েছেন। আমার কাছে মনে হয়েছে, আন্দোলনকে সফলতার দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের অবদান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি।
প্রশ্ন: জুলাই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড আসলে কে?
সাদিক কায়েম: আমি ব্যক্তিগতভাবে মাস্টারমাইন্ড শব্দটির সঙ্গে একমত নই। এই ধরনের গণঅভ্যুত্থানের কোনো একক মাস্টারমাইন্ড হয় না। যদি কাউকে এই বিপ্লবের প্রকৃত নায়ক বলতে হয়, তাহলে তারা হচ্ছেন শহীদরা। যারা জীবন দিয়েছেন, যারা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, যারা নির্যাতন সহ্য করেছেন—তারাই এই আন্দোলনের মূল শক্তি। আমরা যারা সমন্বয় করেছি, পরিকল্পনা করেছি বা নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করেছি, তারা প্রত্যেকে একটি করে ভূমিকা পালন করেছি মাত্র। কিন্তু আন্দোলনের সফলতার সবচেয়ে বড় মূল্য দিয়েছে শহীদ পরিবারগুলো। তাই ইতিহাসে যদি কারও নাম সবচেয়ে আগে লেখা উচিত হয়, তাহলে সেটি শহীদদের।
প্রশ্ন: দুই বছর পর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অর্জন ও সীমাবদ্ধতা কী দেখেন?
সাদিক কায়েম: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে এখনো বড় ব্যবধান রয়েছে। জুলাই সনদ, রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়নে জনগণের প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। তবে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো— জনগণ ঐক্যবদ্ধ হলে কোনো ফ্যাসিবাদই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
আগামীর সময়




