মাইক্রোপ্লাস্টিকের ক্ষতি এড়াতে বদলান এই অভ্যাসগুলো

বরিশাল জার্নাল ডেস্ক

মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন বিশ্বের অন্যতম আলোচিত স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সমস্যা। একসময় মনে করা হতো, এটি শুধু নদী, সমুদ্র বা মাটির দূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু এখন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, খাবার, পানীয়, বাতাস এমনকি মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মিলছে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক পুরোপুরি এড়িয়ে চলা এখন প্রায় অসম্ভব। কারণ প্লাস্টিক আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। তবে কিছু সহজ অভ্যাস গড়ে তুললে শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

নিচে এমন কিছু কার্যকর উপায় তুলে ধরা হলো।

প্লাস্টিকের বোতলের বদলে কাচ বা স্টেইনলেস স্টিলের বোতল ব্যবহার করুন

অনেকেই প্রতিদিন প্লাস্টিকের বোতলে পানি বহন করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ব্যবহারে বা গরমে থাকলে এসব বোতল থেকে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা পানিতে মিশে যেতে পারে। তাই সম্ভব হলে কাচ বা স্টেইনলেস স্টিলের পানির বোতল ব্যবহার করুন। এগুলো দীর্ঘস্থায়ী এবং তুলনামূলক নিরাপদ।

প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার গরম করবেন না

মাইক্রোওয়েভে প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার গরম করলে তাপের কারণে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা খাবারের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। খাবার গরম করার জন্য কাচ, সিরামিক বা মাইক্রোওয়েভ নিরাপদ হিসেবে চিহ্নিত পাত্র ব্যবহার করা ভালো। বিশেষ করে তেলযুক্ত বা গরম খাবার কখনোই সাধারণ প্লাস্টিকের পাত্রে গরম না করাই ভালো।

গরম খাবার প্লাস্টিকের পাত্রে রাখবেন না

শুধু গরম করাই নয়, চুলা থেকে নামানো গরম খাবারও প্লাস্টিকের পাত্রে রাখা ঠিক নয়। বেশি তাপ প্লাস্টিকের গঠন পরিবর্তন করতে পারে এবং ক্ষুদ্র কণা খাবারে চলে আসতে পারে। খাবার কিছুটা ঠান্ডা হলে প্রয়োজনে প্লাস্টিকের পাত্রে সংরক্ষণ করুন। তার আগে কাচ বা স্টিলের পাত্র ব্যবহার করাই ভালো।

একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক কম ব্যবহার করুন

প্লাস্টিকের কাপ, প্লেট, চামচ, স্ট্র কিংবা খাবারের বাক্স একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া হয়। এসব পণ্যের অনেকগুলো সহজেই ভেঙে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণায় পরিণত হয়। সম্ভব হলে পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য ব্যবহার করুন। এতে শুধু নিজের নয়, পরিবেশেরও উপকার হবে।

প্রসেসড খাবার কম খান

যত বেশি একটি খাবার প্রক্রিয়াজাত হয়, উৎপাদন ও প্যাকেজিংয়ের সময় তত বেশি প্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা থাকে। তাই তাজা ফল, শাকসবজি এবং বাড়িতে তৈরি খাবার বেশি খাওয়ার চেষ্টা করুন।

ফিল্টার করা পানি পান করুন

কলের পানি বা বোতলজাত পানিতে খুব অল্প পরিমাণে হলেও মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকতে পারে। বাড়িতে ভালো মানের পানি পরিশোধক ব্যবহার করলে কিছু ক্ষেত্রে এসব ক্ষুদ্র কণার পরিমাণ কমানো সম্ভব। তবে সব ধরনের ফিল্টার সমান কার্যকর নয়। তাই প্রয়োজনে মানসম্মত ফিল্টার বেছে নিন।

প্লাস্টিকের কাটিং বোর্ডের বদলে কাঠের বোর্ড ব্যবহার করুন

রান্নাঘরে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের কাটিং বোর্ডে ছুরির আঘাতে ধীরে ধীরে ছোট ছোট প্লাস্টিক কণা তৈরি হতে পারে। কাঠের বা বাঁশের কাটিং বোর্ড ব্যবহার করলে এই ঝুঁকি কমে।

প্রাকৃতিক তন্তুর পোশাক বেছে নিন

পলিয়েস্টার, নাইলন বা অ্যাক্রিলিকের মতো সিনথেটিক কাপড় ধোয়ার সময় ক্ষুদ্র প্লাস্টিক তন্তু পানির সঙ্গে বের হয়ে যায়। তাই সুযোগ থাকলে তুলা, লিনেন, উল বা অন্যান্য প্রাকৃতিক তন্তুর পোশাক ব্যবহার করুন। এতে শরীর ও পরিবেশ উভয়ই উপকৃত হবে।

ঘরের ধুলাবালি নিয়মিত পরিষ্কার করুন

মাইক্রোপ্লাস্টিক শুধু খাবারে নয়, ঘরের ধুলার মধ্যেও থাকতে পারে। নিয়মিত ভেজা কাপড় দিয়ে মেঝে ও আসবাব পরিষ্কার করুন। প্রয়োজনে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ফিল্টারযুক্ত ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ব্যবহার করতে পারেন। এতে বাতাসে ভাসমান ক্ষুদ্র কণা কিছুটা কমানো সম্ভব।

চা বানানোর সময় প্লাস্টিকের টি ব্যাগ এড়িয়ে চলুন

কিছু টি ব্যাগে প্লাস্টিক উপাদান ব্যবহার করা হয়। গরম পানিতে এগুলো থেকে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বের হতে পারে। সম্ভব হলে ঢিলা চা পাতা বা প্লাস্টিকমুক্ত টি ব্যাগ ব্যবহার করুন।

প্লাস্টিকের মোড়কে গরম খাবার কিনতে সতর্ক থাকুন

অনেক সময় গরম খাবার সরাসরি প্লাস্টিকের ব্যাগ বা পাতলা প্লাস্টিকের পাত্রে দেওয়া হয়। খুব গরম খাবার প্লাস্টিকের সংস্পর্শে এলে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা খাবারে চলে আসার আশঙ্কা বাড়তে পারে। তাই সুযোগ থাকলে নিজের পাত্র ব্যবহার করুন অথবা কাগজ, কাচ বা অন্য নিরাপদ প্যাকেজিং বেছে নিন।

প্রসাধনী কেনার সময় উপাদানের তালিকা দেখুন

কিছু প্রসাধনী বা ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্যে প্লাস্টিকজাত উপাদান থাকতে পারে। পণ্য কেনার আগে উপাদানের তালিকা দেখে নেওয়ার অভ্যাস করুন। পরিবেশবান্ধব বা মাইক্রোপ্লাস্টিকমুক্ত পণ্য বেছে নেওয়া ভালো।

প্লাস্টিকের পাত্র পুরোনো হয়ে গেলে বদলে ফেলুন

পুরোনো, ফেটে যাওয়া বা আঁচড় পড়া প্লাস্টিকের পাত্র দ্রুত ক্ষয় হতে পারে। এ ধরনের পাত্র ব্যবহার না করে সময়মতো নতুন ও নিরাপদ বিকল্প ব্যবহার করুন।

শিশুদের জন্য বাড়তি সতর্কতা

শিশুরা অনেক সময় প্লাস্টিকের খেলনা মুখে দেয় বা প্লাস্টিকের বোতল ব্যবহার করে। তাই তাদের জন্য মানসম্মত ও নিরাপদ পণ্য বেছে নিন। ক্ষতিগ্রস্ত বা নিম্নমানের প্লাস্টিকের খেলনা ব্যবহার না করাই ভালো।

সম্পূর্ণভাবে এড়ানো সম্ভব নয়, তবে ঝুঁকি কমানো সম্ভব

বর্তমান পৃথিবীতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পুরোপুরি এড়িয়ে চলা প্রায় অসম্ভব। কারণ এটি বাতাস, পানি, খাবার এবং দৈনন্দিন নানা পণ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।

তবে ছোট ছোট কিছু পরিবর্তন বড় পার্থক্য গড়ে তুলতে পারে। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, নিরাপদ পাত্র বেছে নেওয়া, তাজা খাবার খাওয়া এবং ঘর পরিষ্কার রাখার মতো অভ্যাস শুধু মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঝুঁকি কমায় না, সামগ্রিকভাবে একটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনেও সাহায্য করে।

এশিয়া পোস্ট

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top