বরিশাল জার্নাল ডেস্ক
দীর্ঘ আট বছর পর অনুষ্ঠিত আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ইতিহাস গড়েছেন নাশরা নাঈম। বিশ্ববিদ্যালয়টির শত বছরের বেশি সময়ের ইতিহাসে প্রথম নারী হিসেবে ছাত্র সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়ার।
উত্তর প্রদেশের গোরখপুরের বাসিন্দা নাশরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের (এলএলবি) শিক্ষার্থী। এর আগে তিনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত উইমেনস কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা করেছেন। তার বাবাও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী।
জানা গেছে, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়ে নাশরা জানান, শুরুতে তিনি সভাপতি পদে প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন। তবে তার বাবা বিষয়টি নিয়ে কিছুটা দ্বিধায় ছিলেন। কারণ, দীর্ঘদিন পর ছাত্র সংসদ পুনরায় চালু হওয়ার পরপরই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একজন নারীকে সভাপতি হিসেবে গ্রহণ করবেন কি না, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান ছিলেন।
নাশরা বলেন, ‘প্রথমে আমি সভাপতি পদে নির্বাচন করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার বাবা বিশ্ববিদ্যালয়টিকে খুব ভালোভাবে চেনেন। তিনি বলেছিলেন, ছাত্র সংসদ পুনরায় চালুর পরপরই ক্যাম্পাস একজন নারী সভাপতিকে গ্রহণ করবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আমি বিষয়টি বিবেচনা করেছি। কারণ, আমি জয়ের লক্ষ্য নিয়েই নির্বাচন করছি। তাই শেষ পর্যন্ত সহসভাপতি পদে প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। তবে পুরো সময় আমার পরিবার আমাকে সমর্থন দিয়েছে।’
নির্বাচনে নাশরা সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এ ছাড়া সভাপতি পদে নোমান আশরাফ এবং সম্মানসূচক সাধারণ সম্পাদক পদে মোহাম্মদ হামদান নির্বাচিত হয়েছেন।
আট বছর পর নির্বাচন, ১৯ দিনের আন্দোলন
গত ৫ নভেম্বর আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৯ সাল থেকে ক্যাম্পাসে সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণ দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্র সংসদ স্থগিত রেখেছিল। দীর্ঘদিন পর নির্বাচন আয়োজনের দাবিতে শিক্ষার্থীরা টানা ১৯ দিন আন্দোলন করেন। এক এমএ শিক্ষার্থী অনশন শুরু করলে আন্দোলন আরও জোরালো হয়। পরে প্রশাসন ছাত্র সংসদ পুনরায় চালুর বিষয়ে সম্মত হয়।
আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনের সিদ্ধান্তের পরপরই দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়াতেও একই দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। সেখানে প্রায় দুই দশক ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ওই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে সম্মতি দেয়।
দীর্ঘ আন্দোলনের পর নির্বাচন আয়োজন এবং নাশরার ঐতিহাসিক জয়—দুই বিষয়ই বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নাশরা নিজেও ছাত্র সংসদ পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন। নির্বাচনী প্রচারে তার দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল—পুরোনো ও সময়োপযোগী নয় এমন শিক্ষাক্রম হালনাগাদ করা এবং ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের অবাধে বসা, কথা বলা ও মতবিনিময়ের জায়গা বাড়ানো। উদাহরণ হিসেবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান লাইব্রেরির ক্যানটিন আগের তুলনায় দ্রুত বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন।
ক্যাম্পাসে রাজনীতির গুরুত্ব তুলে ধরে নাশরা বলেন, ‘রাজনীতিকে বাঁচিয়ে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সবকিছুই রাজনৈতিক। আপনি যদি রাজনৈতিকভাবে সচেতন না হন, তাহলে রাষ্ট্র বা প্রশাসন আপনার ওপর কী প্রভাব ফেলছে, তা বুঝতে পারবেন না। কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে কেন বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে, সেটির কারণও বুঝবেন না। বিশেষ করে করোনার পর মানুষ অনেক বেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। তারা সমাজ বা বৃহত্তর সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে খুব একটা ভাবছে না। এতে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়।’
ছাত্র সংসদ নির্বাচন ও ক্যাম্পাস রাজনীতি পুনরায় চালুর মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি থেকে ভবিষ্যতের নেতৃত্ব তৈরি হওয়ার পরিবেশ ফিরে আসবে বলে আশা করছেন নাশরা।
তিনি বলেন, ‘আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নেতৃত্বের ঘাটতি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এখানে বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বও ছিল না। বিষয়টি নিয়ে অনেকে কথা বলছেন। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতা শব্দটিকেও নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। কারণ, ক্যাম্পাসের নির্বাচনে বিভিন্ন আঞ্চলিক গোষ্ঠীর প্রভাব তৈরি হয়েছিল।’




