জিব্রান কাদির
ভোরের কুয়াশার চাদর ভেদ করে পূব আকাশে যখন রক্তিম সূর্য উঁকি দেয়, ঠিক তখনই যেন প্রকৃতি তার নিজস্ব ক্যানভাসে এঁকে দেয় এক অলৌকিক লাল গালিচা। চোখ যতদূর যায়, কেবলই টকটকে লাল শাপলার সমারোহ। রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ হয়তো এই রূপ দেখেই বলেছিলেন— ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে— এই বাংলায়…’। প্রকৃতির এমন অপূর্ব নৈসর্গিক রূপ দেখতে চাইলে আপনাকে যেতে হবে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বিখ্যাত ‘সাতলা বিলে’।
পর্যটকদের কাছে এটি এখন ‘লাল শাপলার গ্রাম’ নামেই সমধিক পরিচিত।
প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা ক্যানভাস
বরিশাল শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই সাতলা বিল। প্রায় ১০ হাজার একর জলাভূমি নিয়ে বিস্তৃত এই বিলে আগস্ট থেকে নভেম্বর— এই চার মাস ফুটে থাকে অজস্র লাল শাপলা। তবে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে শাপলার উপস্থিতি থাকে সবচেয়ে বেশি।
ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় যখন বিলের শান্ত পানিতে শাপলাগুলো পাপড়ি মেলে ধরে, তখন মনে হয় যেন পুরো বিলজুড়ে লাল রঙের মেলা বসেছে। সূর্যের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শাপলার পাপড়িগুলো বুজে যেতে শুরু করে, তাই লাল শাপলার আসল রূপ উপভোগ করতে হলে পৌঁছাতে হবে একদম ভোরবেলা, সূর্য ওঠার ঠিক মুহূর্তে।

বিলপাড়ের মানুষের জীবন–জীবিকা
সাতলা বিলের সৌন্দর্য কেবল পর্যটকদের মনই ভোলায় না, স্থানীয় শত শত পরিবারের জীবন-জীবিকার মূল ভিত্তিও এই বিল। বিলের আশপাশের অধিকাংশ অধিবাসী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শাপলার ওপর নির্ভরশীল। কেউ নৌকায় করে পর্যটক ঘুরিয়ে আয় করেন, আবার কেউ ভোরে বিল থেকে শাপলা তুলে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন।
সবজি হিসেবে লাল শাপলার রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। তবে বর্তমানে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠায় স্থানীয় তরুণদের অনেকেই এখন নৌকা চালনা ও গাইডের কাজকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
বিলে কীভাবে ঘুরবেন?
বিলে ঘুরে বেড়ানোর জন্য ছোট ছোট কাঠ ও অ্যালুমিনিয়ামের নৌকা রয়েছে। মাঝি হিসেবে পাবেন স্থানীয় কিশোর ও যুবকদের, যারা পরম মমতায় পুরো বিল ঘুরে দেখাবে। শান্ত পানিতে নৌকার বৈঠার ছপছপ শব্দ আর চারপাশে লাল শাপলার মেলা মুহূর্তেই আপনাকে শহুরে ব্যস্ততা ও যান্ত্রিকতা থেকে এক স্বপ্নের জগতে নিয়ে যাবে। এছাড়া বিলে ভেসে বেড়ানো নানা প্রজাতির দেশি ও পরিযায়ী পাখির কলকাকলি এই ভ্রমণের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ।
ভ্রমণ নির্দেশিকা
- কখন যাবেন: লাল শাপলা দেখার সেরা সময় আগস্ট থেকে নভেম্বর। তবে সবচেয়ে বেশি শাপলা মেলে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে।
- দিনের সেরা সময়: অবশ্যই ভোর ৬টা থেকে সকাল ৮টার মধ্যে বিলে পৌঁছাতে হবে। ৮টার পর রোদ বাড়লে শাপলা ফুল বুজে যায়।
- কীভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে সড়ক বা নৌপথে বরিশাল পৌঁছানো যায়। বরিশাল শহরের নথুলাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে সিএনজি/মাহেন্দ্র ভাড়া করে যাওয়া যায়। সময় লাগবে প্রায় ১.৫ থেকে ২ ঘণ্টা।
- সতর্কতা: বিলে নেমে অপ্রয়োজনে শাপলা ফুল ছিঁড়বেন না। পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখুন এবং প্লাস্টিক বা ময়লা বিলে ফেলা থেকে বিরত থাকুন।




