আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রায় তিন বছর পর আবারও শ্রেণিকক্ষে ফিরেছে গাজার কয়েক লাখ শিশু। শনিবার নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনে তারা স্কুলে গেলেও অনেক শিক্ষার্থীকে পড়তে হচ্ছে তাঁবু, ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ও অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্রের ভেতরে।
জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, যুদ্ধের কারণে গাজার ৯৮ শতাংশ স্কুল ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিক্ষা কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে সরাসরি শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল।
তিন বছর পর স্কুলে ফিরতে পেরে অনেক শিক্ষার্থী আনন্দ প্রকাশ করেছে। খান ইউনিসের শিক্ষার্থী মোয়ায়েদ আবু মুস্তাফা বলেন, তিন বছর আগে শেষবার স্কুলে গিয়েছিলেন তিনি। এবার নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ায় তিনি আনন্দিত এবং পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চান।
তবে স্কুলে ফিরে শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে। অনেকের ভালো জুতা, খাতা ও কলম নেই। কেউ কেউ তাঁবুর মেঝেতে বসে ক্লাস করছে। এসব তাঁবুতে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থাও নেই।
মোয়ায়েদ বলেন, এত সমস্যার মধ্যেও তারা পড়াশোনা চালিয়ে যাবেন, এমনকি তাঁবুর মধ্যেও।
১৫ বছর বয়সী বাস্তুচ্যুত শিক্ষার্থী সামার আবু সালমিও তার পরিবারের সঙ্গে একটি তাঁবুতে বসবাস করছেন। যুদ্ধের সময় তিনি ফোনের মাধ্যমে পড়াশোনা করতেন এবং শিক্ষকদের সরাসরি দেখতে পেতেন না। এখন অস্থায়ী স্কুলে ফিরে আবার নিজের স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করছেন তিনি।
সামার জানান, যুদ্ধের আগে খাতা, কলম, পোশাকসহ প্রয়োজনীয় জিনিস সহজেই পাওয়া যেত এবং দামও তুলনামূলক কম ছিল। এখন এসব জিনিস অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
তাঁবু ও অস্থায়ী স্কুলে নতুন শিক্ষাবর্ষ
গাজার ভয়াবহ ধ্বংসের মধ্যেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ শুরু করেছে। শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁবু, ত্রিপল, টিন ও কাঠ দিয়ে কয়েক ডজন অস্থায়ী স্কুল তৈরি করা হয়েছে।
কিছু স্কুল বালুর ওপর তৈরি করা হয়েছে। কোথাও শ্রেণিকক্ষে শুধু কয়েকটি গদি ও একটি ব্ল্যাকবোর্ড রয়েছে। আবার কিছু স্কুলে এখনো বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো বসবাস করছে।
১৪ বছর বয়সী ইয়ামেন আবু সামরাও একটি অস্থায়ী স্কুলে ক্লাস করছে। সে জানায়, যুদ্ধের আগে স্কুলে যাওয়ার সময় আনন্দ লাগত। এখন স্কুলে যাওয়ার সময় পথে গুলি, রকেট ও হামলার ভয় কাজ করে।
তার ভাষায়, বর্তমানে সে এমন একটি তাঁবুতে বসে ক্লাস করছে যেখানে সূর্যের তাপ ছাড়া তেমন কোনো সুবিধাই নেই।
শিক্ষা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইউনিসেফের সহায়তায় এ বছর অন্তত ৫ লাখ ৪০ হাজার শিক্ষার্থী অস্থায়ী বেসরকারি স্কুল, অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র ও বিভিন্ন শিক্ষা পয়েন্টে সরাসরি ক্লাস করবে। যারা সরাসরি ক্লাসে যেতে পারবে না বা যুদ্ধের সময় গাজা ছেড়ে গেছে, তাদের জন্য অনলাইন পড়াশোনা চালু থাকবে।
গত বছরের যুদ্ধবিরতির পর বড় ধরনের লড়াই কমলেও গাজার ৬০ শতাংশের বেশি এলাকার নিয়ন্ত্রণ এখনো ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে রয়েছে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের নেতৃত্বে যোদ্ধারা দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষকে হত্যা করার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হয়। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের দাবি, ওই অভিযানে এখন পর্যন্ত ৭৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
বেড়েছে খাতা-কলমের দাম
গাজায় যুদ্ধের কারণে শিক্ষা উপকরণের দামও অনেক বেড়েছে। স্টেশনারি ব্যবসায়ী ৩০ বছর বয়সী খালেদ আলিয়ান জানান, ইসরায়েলের আমদানি বিধিনিষেধের কারণে সরবরাহ কমে গেছে এবং দাম বেড়েছে।
তিনি বলেন, যে খাতার দাম আগে ৩ শেকেল বা ১ ডলার ছিল, এখন সেটির দাম ১৫ শেকেল। প্রায় সব ধরনের স্টেশনারি পণ্যের দামই বেড়েছে।
গাজায় পণ্য সরবরাহ ও প্রবেশ নিয়ন্ত্রণকারী ইসরায়েলের কোগাট সামরিক সংস্থা শিক্ষা উপকরণ সরবরাহের বিধিনিষেধ এবং স্কুলে হামলার বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।
ইসরায়েল বারবার অভিযোগ করেছে, হামাস সামরিক কাজে স্কুলগুলো ব্যবহার করে। তবে হামাস এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সূত্র : রয়টার্স




