গভীর রাতে মুসলিমদের ধরপাকড় করছে পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ

বরিশাল জার্নাল ডেস্ক

বাংলাদেশি নাগরিক সন্দেহে গত জুন থেকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের অভিযানে অন্তত ৯ মুসলিম পুরুষ ও দুই শিশুকে তাদের বাড়ি থেকে আটক করে ডিটেনশন বা হোল্ডিং সেন্টারে পাঠানো হয়েছে । এসব আটকের অধিকাংশই মুর্শিদাবাদ জেলার বাসিন্দা।

আটক ব্যক্তিদের পরিবারের অভিযোগ, বেশ কয়েকটি অভিযান গভীর রাতে পরিচালনা করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশ কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, রিমান্ড আদেশ কিংবা এফআইআরের কপি দেখায়নি বলেও তারা দাবি করেছেন। পরিবারের সদস্যদের আরো অভিযোগ, আটক করার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ উপস্থাপনের কার্যকর সুযোগ দেওয়া হয়নি।

মুর্শিদাবাদের ৬১ বছর বয়সি ইব্রাহিম শেখকে ২৯ জুলাই রাত সাড়ে ১২টার দিকে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয় বলে তার পরিবারের দাবি। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ইব্রাহিম তার আধার ও ভোটার পরিচয়পত্র দেখালেও তাকে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে একটি ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়। এরপর তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

উত্তর দিনাজপুর জেলার আরেক বাসিন্দা ৬৭ বছর বয়সি জলিল আখতারকেও বাড়ির বাইরে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তার পরিবার দাবি করেছে, জলিল ভারতীয় নাগরিক এবং তার নাম একাধিক নির্বাচনি ভোটার তালিকায় রয়েছে, এমনকি ২০২৬ সালের ভোটার তালিকায়ও তার নাম রয়েছে। তবে পুলিশের অভিযোগ, তিনি বাংলাদেশের নাগরিক।

অভিযোগ রয়েছে, আবদুল জব্বারকে তার দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেসহ নিয়ে যাওয়া হয়। পরিবারের দাবি, আবদুল জব্বারের ভারতীয় পাসপোর্ট, ভোটার পরিচয়পত্রসহ বিভিন্ন সরকারি নথি রয়েছে। তার স্ত্রী পরে খিঁচুনিতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।

আটক ব্যক্তিদের কয়েকজন সাম্প্রতিক নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে অন্তত চারজন নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা এসআইআর (বিশেষ নিবিড় সংশোধন) প্রক্রিয়ার যাচাইও সম্পন্ন করেছিলেন।

আটকের পদ্ধতি নিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মুর্শিদাবাদভিত্তিক অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটসের কর্মী জাকির হোসেনের অভিযোগ, কিছু মানুষকে আদালতে হাজির না করেই আটক রাখা হচ্ছে।

অন্তত একটি ঘটনায় পুলিশ আটক এক ব্যক্তিকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করেছিল। ওই ব্যক্তি নিজেকে ভারতীয় নাগরিক দাবি করলে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফ তাকে ফিরিয়ে দেয়। পরে পুলিশ তার বিরুদ্ধে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট, ২০২৫-এর অধীনে মামলা করে।

পরিবারগুলোর প্রশ্ন, ভোটার পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, জমির নথি এবং অন্যান্য সরকারি কাগজপত্র থাকা ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব নির্ধারণের আগে কেন তাদের কার্যকর আইনি সুযোগ দেওয়া হবে না। তাদের দাবি, নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ থাকলে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তা নিষ্পত্তি করা উচিত।

পশ্চিমবঙ্গে কথিত অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্তকরণ ও আটক নিয়ে নজরদারি বাড়ার মধ্যে এসব ঘটনা বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানদের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের আচরণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অধিকারকর্মীরা ডিটেনশন সেন্টারগুলোতে কতজনকে রাখা হয়েছে, তাদের কী আইনি অবস্থান এবং নাগরিকত্ব নির্ধারণে কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে—এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা দাবি করেছেন।

তবে এসব অভিযোগ ও ঘটনাবলি স্ক্রলের অনুসন্ধানে প্রকাশিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আটকের বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বক্তব্য প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদাভাবে জানা এবং তা প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

সূত্র: মুসলিম মিরর ও স্ক্রল ডট ইন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top