৩০ বছরেও বাড়েনি নাগরিক সেবার মান, নানা দুর্ভোগে জর্জরিত পিরোজপুর পৌরসভা

বরিশাল জার্নাল ডেস্ক

প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো পিরোজপুর পৌরসভা ১৯৯০ সালে অর্জন করেছিল প্রথম শ্রেণির পৌরসভার মর্যাদা। তবে দীর্ঘ তিন দশকেও বাড়েনি নাগরিক সেবার মান, বরং সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পৌরবাসীর ভোগান্তি।

ভাঙাচোরা সড়ক, সুপেয় পানির তীব্র সংকট, অপরিকল্পিত ও অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ, জলাবদ্ধতা ও মশার উপদ্রব থেকে শুরু করে অবৈধ খাল দখল—নানা সমস্যায় জর্জরিত পুরো শহর। অথচ প্রতি বছর নিয়ম মেনে হোল্ডিং ট্যাক্স ও পানি বিল পরিশোধ করলেও প্রত্যাশিত সেবা না পাওয়ার অভিযোগ বাসিন্দাদের।

শহরের পুলিশ লাইন্স কিংবা বলাকা সড়কের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয় পৌরসভার বাস্তব চিত্র। খানাখন্দে ভরা এসব রাস্তায় বৃষ্টি হলেই জমে পানি। শুধু এই দুটিই নয়, পৌরসভার প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার সড়ক নেটওয়ার্কের বড়ো একটি অংশই এখন চলাচলের অনুপযোগী। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝে মাঝেই নামমাত্র সংস্কার করা হলেও নিম্নমানের কাজের কারণে কয়েক মাসের মধ্যেই সড়কগুলো আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।

সড়কের পাশাপাশি রয়েছে সুপেয় পানির তীব্র সংকট। অনেক এলাকায় নিয়মিত পানি সরবরাহ করাও হয় না। অপরিকল্পিত ও অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে পুরো শহরে। দীর্ঘদিন ড্রেন পরিষ্কার না করায় ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ, বাড়ছে মশার উপদ্রব এবং ডেঙ্গুর ঝুঁকি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শহরের খালগুলো দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা আরও তীব্র আকার ধারণ করছে। পৌরসভাকে নিয়মিত কর দেওয়ার পরেও ঠিকভাবে সেবা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ শহরের উকিলপাড়ার বাসিন্দা ব্যবসায়ী মো. আকতার হোসেনের। এ ছাড়াও সাবেক ডিসি আশরাফুল আলম খান সমস্যা সমাধানে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, কিন্তু বর্তমানে কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মাদ্রাসা শিক্ষক মো. মামুন হোসেন বলেন, প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হলেও মনে হয় দেশের সবচেয়ে অবহেলিত অজপাড়াগাঁয়ে বাস করছি। খানাখন্দে ভরা রাস্তায় বৃষ্টিতে পানি জমে মাছ চাষের অবস্থা হয়। পানির বিল ঠিকই দিচ্ছি, কিন্তু সুপেয় পানি তো দূরের কথা, ব্যবহারের পানি পেতেও হাঁসফাঁস করতে হয়।

এ ছাড়াও খালগুলো স্থানীয় প্রভাবশালীরা বিভিন্ন স্থাপনা করে দখল করে রাখছে, এজন্য খালেও পানি আসে না। ড্রেনেজ ব্যবস্থা এই শহরে নেই বললেই চলে। এমন একটি শহরে আছি, এটা সম্ভবত থার্ড ক্লাস পৌরসভার মধ্যেও পড়ে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।

পৌরসভার মাছিমপুর এলাকার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও রাজনীতিবিদ মো. আল আমিন খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমরা সঠিকভাবে পৌরসভাকে কর দিলেও তাদের সেবাগুলো আমরা পাই না। সুপেয় পানির তীব্র সংকট রয়েছে। পৌরবাসীর যে পরিমাণ পানির চাহিদা রয়েছে সেই পরিমাণে পানি দেওয়া হয় না এবং আমরা যারা সিটিজেন রয়েছি তাদের নিয়ে একটি মিটিং করেছিল সেখানে আমরা দাবি জানিয়েছিলাম পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় মশা নিধনে স্প্রে করা প্রয়োজন। আরও একটি দাবি করেছিলাম আমাদের যে পৌরসভার ৮ নম্বর রোডটি প্রায় ২০ বছর ধরে কোনো সংস্কার করা হয়নি। শহরের জেলা হাসপাতালের চার পাশের ড্রেনগুলো অনেক দিন পরিষ্কার করা হয় না। যে কারণে ডেঙ্গুসহ নানা রোগে আক্রান্ত হন এলাকাবাসী।

পৌরবাসীর এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী ধ্রুব লাল দত্ত বণিক এশিয়া পোস্টকে জানান, মূলত বাজেট সংকটের কারণে একযোগে সব কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে সড়ক, পানি ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে কয়েকটি নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে শিগগিরই দৃশ্যমান কাজ শুরু হবে।

পৌরবাসীর দাবি, বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যার কথা শুনিয়ে শুধু আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে দৃশ্যমান উন্নয়ন নেই। একটি প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে ভাঙাচোরা সড়ক সংস্কার, নিরাপদ পানি সরবরাহ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, খাল উদ্ধার এবং মশা নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

এশিয়া পোস্ট

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top