আন্তর্জাতিক ডেস্ক
কলকাতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভেতরে অবস্থিত ১৩৬ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক গৌরীপুর জামে মসজিদে (বাঁকড়া মসজিদ) নামাজ বন্ধের সিদ্ধান্তে পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রতিবাদে রাজ্যের প্রায় ১ কোটি মুসলিমকে কালো ব্যাজ পরে জুমার নামাজে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের পশ্চিমবঙ্গ শাখার সভাপতি ও রাজ্যের সাবেক গ্রন্থাগারমন্ত্রী সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) জুমার নামাজে এই প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার কলকাতায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন তিনি।
বিমানবন্দরের ৭ নম্বর গেটের বাইরে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের ডাক দিয়ে সিদ্দিকুল্লা বলেন, ‘১৩৬ বছরের পুরোনো মসজিদে অন্যায় ও অবৈধভাবে নামাজ বন্ধের বিরুদ্ধে আমরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করব। সকাল সাড়ে ১১টা নাগাদ এলাকার মানুষ সেখানে নামাজ পড়তে যাবেন। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ, আমাদের যেন নামাজ আদায় করতে দেওয়া হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘যদি ঢুকতে না দেওয়া হয়, তবে আমরা কোনো ধস্তাধস্তি বা অশান্তি করব না, কারণ আমরা শান্তিপ্রিয়। একইসঙ্গে বাংলার ১ কোটি মুসলিমদের কাছে অনুরোধ, আপনারা কালো ব্যাজ পরে নামাজ পড়তে যান এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করে ফিরে আসুন। কোনো বিক্ষোভ প্রদর্শন, মাইকিং বা প্রচারের দরকার নেই।’
সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী অভিযোগ করেন, গত ২৪ বছর ধরে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের সরকারি যোগাযোগ রয়েছে। যদি সত্যিই বিমানবন্দরের উন্নয়নমূলক কাজের জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে, তবে অন্তত একটি নোটিশ দেওয়া বা আলোচনায় বসা উচিত ছিল। তাদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, তা অনভিপ্রেত।
তিনি আরও বলেন, এটি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিষয় নয়, সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয় সরকারের বিষয়। কেন্দ্র সরকারের উচিত দারুল উলুম দেওবন্দ, জমিয়তে উলেমা-এ-হিন্দ ও সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটির দায়িত্বশীলদের সঙ্গে আলোচনায় বসা। প্রয়োজন হলে আমরাও তাদের সঙ্গে থাকব, যাতে আইন মেনে ও আলোচনার মাধ্যমে এই মসজিদ স্থানান্তরের একটি সুষ্ঠু সমাধান সূত্র বের করা যায়।
সিদ্দিকুল্লাহর দাবি, এই বিষয়ে অভিযোগ জানাতে বুধবার রাতে তারা থানায় গেলেও পুলিশ তাদের অভিযোগ গ্রহণ করেনি এবং বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও কোনো সহযোগিতা মেলেনি।
তবে এই ইস্যুতে সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীর বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছে বিজেপি। দমদম উত্তরের বিজেপি বিধায়ক সৌরভ সিকদার বলেন, ‘এই বাংলায় কোনো জামায়াতি বা শরিয়তি আইন চলবে না। এখানকার শান্তিপ্রিয় মুসলমান ভাইদের কাছে অনুরোধ, কারও উস্কানিতে পা দিয়ে আইন ভাঙার কাজ করবেন না। এখানে দেশ সবার আগে, নিরাপত্তা সবার আগে। জাতীয় নিরাপত্তা ও দেশের প্রশ্নে কখনো ধর্ম বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।’
সিদ্দিকুল্লাকে নিশানা করে তিনি বলেন, ওনার মতো লোকেরা ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করে, আপনারা কেউ উস্কানিতে পা দেবেন না।
অন্যদিকে, এই মসজিদ বিতর্ক নিয়ে মুখ খুলেছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘ওই নির্দিষ্ট সংবেদনশীল এলাকায় যদি মসজিদের বদলে বজরংবলীর (হনুমানজি) মন্দিরও থাকত, তবে দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে সেটিকেও সেখান থেকে সরানো হতো।’
কেন সরানো হচ্ছে মসজিদ?
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (দমদম) কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, বিমানবন্দরের দ্বিতীয় (সেকেন্ডারি) রানওয়ে সম্প্রসারণ ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই এই ঐতিহাসিক গৌরীপুর জামে মসজিদটি অন্যত্র সরানো জরুরি হয়ে পড়েছে। বর্তমানে মসজিদটি রানওয়ে থেকে মাত্র ১৬৫ মিটার দূরে অবস্থিত।
অথচ আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল সুরক্ষাবিধি অনুযায়ী, রানওয়ে থেকে যে কোনো স্থায়ী কাঠামোর ন্যূনতম দূরত্ব অন্তত ২৪০ মিটার হওয়া বাধ্যতামূলক। মসজিদটি নির্ধারিত দূরত্বের চেয়ে অনেক কাছে থাকায় রানওয়ে সম্প্রসারণের কাজ পুরোপুরি বিঘ্নিত হচ্ছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
এ ছাড়া এভিয়েশন সিকিউরিটির ক্ষেত্রে আরেকটি বড় উদ্বেগের কারণ হলো, এই মসজিদে যারা নামাজ পড়তে ঢুকছেন, তাদের জন্য বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কোনো বৈধ পাস বা সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স ইস্যু হয় না। শুধুমাত্র সাধারণ আধার কার্ড দেখিয়ে বিমানবন্দরের অতি সংবেদনশীল রানওয়ের কাছাকাছি পৌঁছে তারা নামাজ আদায় করেন। দেশের ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তার স্বার্থে এই পুরো বিষয়টি চরম ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছে এয়ারপোর্ট অথরিটি অব ইন্ডিয়া।




