৩৯ বছরে এসেও ১৯ এর ফর্ম, রহস্য জানালেন মেসি

ক্রীড়া ডেস্ক

ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছে আর্জেন্টিনা। ম্যাচ শেষে টিওয়াইসি স্পোর্টসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অধিনায়ক লিওনেল মেসি বলেন, এই জয় শুধু একটি ফুটবল ম্যাচের জয় নয়, এটি পুরো আর্জেন্টিনার মানুষের জন্য বিশেষ একটি মুহূর্ত। তিনি জাতীয় সংগীতের সময়ের আবেগ, দলের লড়াই, সমালোচকদের জবাব এবং আসন্ন ফাইনাল নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন।

ম্যাচের অনুভূতি জানাতে গিয়ে মেসি বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই অবিশ্বাস্য কিছু অনুভব করেছি। যদিও এটি একটি ফুটবল ম্যাচ ছিল, কিন্তু মাঠে প্রবেশের সময় এবং জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় আমরা বিশেষ এক আবেগ অনুভব করেছি। পুরো দল সেটি অনুভব করেছে। এটি সাধারণ কোনো জয় ছিল না। এটি ছিল এমন একটি জয়, যা আর্জেন্টিনার মানুষ চেয়েছিল, আমরাও চেয়েছিলাম। এই জয় আমাদের আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে নিয়ে গেছে।’

টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার আনন্দ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘টানা দুটি বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলা সত্যিই অবিশ্বাস্য। এই দল অসাধারণ। ম্যাচ কঠিন হয়ে যাওয়ার পরও আমরা জয় খুঁজে নিয়েছি। আমরা কখনো বিশ্বাস হারাইনি, চেষ্টা থামাইনি। আমরা বল নিয়ন্ত্রণে রেখে খেলেছি। পিছিয়ে থাকার পরও আমরা নিজেদের খেলাটা খেলেছি। আমরা ইংল্যান্ডকে তাদের অর্ধে আটকে রেখেছিলাম। এই জয় আমাদের জন্য বিশাল আনন্দের।’

দলের মানসিক শক্তির প্রশংসা করে মেসি বলেন, ‘আমরা যা পার করছি, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই আমি এই দলকে বিশ্বাস করেছিলাম। আমি জানতাম, আমরা শেষ চারে থাকব এবং শিরোপার জন্য লড়ব। শেষ পর্যন্ত আমরা আবারও ফাইনালে উঠেছি। আমার মনে হয়, এটি আমাদের টানা পঞ্চম বড় ফাইনাল এবং টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল। এটা সত্যিই অবিশ্বাস্য।’

সমালোচকদের প্রসঙ্গ টেনে মেসি বলেন, ‘এই দল আমাকে অবাক করে না। আমি জানি আমরা কী করতে পারি। হয়তো অনেক মানুষের সন্দেহ ছিল, কারণ আমাদের কয়েকজন খেলোয়াড় পুরোপুরি ফিট ছিল না। কিন্তু এই দল একসঙ্গে থাকলে সব সময় বাড়তি কিছু দিতে পারে। একজন আরেকজনকে অনুপ্রাণিত করে এবং নিজেদের সর্বোচ্চটা উজাড় করে দেয়।’

আর্জেন্টিনার সমর্থকদের উদ্দেশে মেসি আবারও সেই বার্তাই দেন, যা তিনি ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও দিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তটা উপভোগ করুন, যেমন আমরা করছি। আমরা আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছি। আমরা আবারও আর্জেন্টিনাকে বিশ্বের সেরা দুই দলের একটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছি। গত চার বছর ধরে আমরা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দ উপভোগ করছি। এখন আবারও বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলব। সবাই এই মুহূর্ত উপভোগ করুন। আজ আমরা শেষ ধাপটি পার করেছি এবং যা সবাই চেয়েছিল, সেটি অর্জন করেছি। এখন বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলব। এরপর সবকিছুই সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা।’

ফাইনালে প্রতিপক্ষ স্পেনকে নিয়ে মেসি বলেন, ‘স্পেন দুর্দান্ত একটি দল। তাদের দারুণ সব খেলোয়াড় আছে। তারা অনেক বছর ধরে একই দর্শনে ফুটবল খেলছে। আমি তাদের ভালোভাবে চিনি। অনেক খেলোয়াড়ের বিপক্ষে খেলেছি। অনেককে এখনো অনুসরণ করি। তাদের কয়েকজন বার্সেলোনায় খেলে, যে ক্লাবকে আমি ভালোবাসি এবং অনুসরণ করি। এটি বিশ্বকাপের ফাইনাল। আমি মনে করি, ম্যাচটি খুবই সমানে সমান হবে।’

বিশ্বকাপে ধারাবাহিক সাফল্য নিয়ে তিনি বলেন, ‘আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে এখানে আসা—এসবই বিশেষ ব্যাপার। গত চার বছর ধরে আমরা বিশ্বের সেরা দল ছিলাম। কারও ভালো লাগুক বা না লাগুক, কেউ যা-ই বলুক না কেন, আমরা আবারও বিশ্বের সেরা দুই দলের একটি হয়েছি। এটি প্রমাণ করে, আমাদের অর্জন কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। কেউ আমাদের কিছু উপহার দেয়নি। টানা দুটি বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা খুব কম দলের পক্ষেই সম্ভব, আর আমরা সেটি করে দেখিয়েছি।’

বিশ্বকাপের জন্য নিজের প্রস্তুতির কথাও জানান মেসি। তিনি বলেন, ‘শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি এই বিশ্বকাপে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবছিলাম। স্কালোনির সঙ্গে সব সময় এ নিয়ে কথা হয়েছে। আমি সেরা অবস্থায় পৌঁছানোর জন্য যা সম্ভব, সব করেছি। গত এক বছর ধরে নিজেকে প্রস্তুত করেছি। ডিসেম্বর মাসটা আর্জেন্টিনায় কাটিয়েছি। সকাল-বিকেল অনুশীলন করেছি। আমি জানতাম, সেরা অবস্থায় পৌঁছাতে আমাকে সবকিছু দিতে হবে, যাতে বিশ্বকাপটা উপভোগ করতে পারি।’

তিনি আরও বলেন, ‘শেষ কোপা আমেরিকায় আমি শারীরিকভাবে ভালো অবস্থায় ছিলাম না। চিলির বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে চোট পেয়েছিলাম। এরপর পুরো টুর্নামেন্টে সেই সমস্যাটা বহন করেছি। শেষ পর্যন্ত আরেকটি চোট নিয়ে শেষ করতে হয়েছিল। সেটি পেশির চোট ছিল না, কিন্তু পুরো আসরেই আমি স্বাভাবিক ছিলাম না। তাই এবার আমি শতভাগ প্রস্তুতি নিয়েছি, যেন পুরো বিশ্বকাপটা উপভোগ করতে পারি এবং নিজের সর্বোচ্চটা দিতে পারি।’

সবশেষে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই জয় আর্জেন্টিনার মানুষের উদ্দেশে উৎসর্গ করেন মেসি।

তিনি বলেন, ‘আমি আগেই বলেছি, মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পেরে আমরা গর্বিত এবং আনন্দিত। আমাদের কাছে বিশ্বকাপ সব সময়ই বিশেষ। এই সময় আমরা জীবনের অনেক কষ্ট ভুলে যাই। আমাদের দেশে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাদের কাজ নেই, মাসের শেষে সংসার চালাতে কষ্ট হয়, প্রতিদিন সংগ্রাম করে বাঁচতে হয়। তাদের একটু আনন্দ দিতে পারা, আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা, টানা দুটি ফাইনাল খেলা—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মেসি বলেন, ‘ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এটি ছিল বিশেষ একটি ম্যাচ। আমরা হারতে পারতাম না। এই দলের কারও কাছে কোনো দেনা নেই। কিন্তু আপনি তো জানেন, আর্জেন্টিনার মানুষ সব সময় আরও বেশি চায়। আমার বিশ্বাস, আজ যদি আমরা হেরে যেতাম, তাহলে অনেকে আজেবাজে কথা বলত, আর আমরা তাদের সেই সুযোগ দিইনি। আমরা জানতাম, ফুটবলের দিক থেকে আমরা তাদের চেয়ে ভালো দল। তবে এমন ম্যাচে শুধু ফুটবল নয়, ইতিহাসও অনেক সময় প্রভাব ফেলে। তবুও এই ম্যাচটি আমাদের কাছে বিশেষ ছিল এবং আমাদের জিততেই হতো।’

ডেইলি ক্যাম্পাস

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top