অন্ধকারে খুলে নেওয়া হচ্ছে গোমা সেতুর নাট-বল্টু, ঝুঁকিতে ৯২ কোটি টাকার অবকাঠামো

বরিশাল জার্নাল ডেস্ক

বাকেরগঞ্জ উপজেলার রাঙামাটি নদীর ওপর ৯২ কোটি টাকার ব্যয়ে নির্মিত গোমা সেতু উদ্বোধনের পাঁচ মাস না পেরোতেই দেখা দিয়েছে নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ। সেতুতে এখনো স্ট্রিট লাইট স্থাপন না হওয়ায় রাতের বেলায় অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে দুর্বৃত্তরা বিভিন্ন অংশের নাট-বল্টু খুলে নিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে ব্যয়বহুল এ অবকাঠামোর স্থায়িত্ব ও জননিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত শুক্রবার (১০ জুলাই) গভীর রাতে দুর্বৃত্তরা সেতুর মাঝামাঝি অংশে নির্মাণাধীন নিরাপত্তা রেলিংয়ের একাধিক নাট-বল্টু খুলে নিয়ে যায়। অন্ধকারের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে কেউ বিষয়টি টের না পেলেও সকালে ঘটনাটি জানাজানি হলে এলাকায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।

সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি বছরের ১৭ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের পর থেকেই সেতুটিতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়নি। এখন পর্যন্ত কোনো স্ট্রিট লাইট স্থাপন না হওয়ায় সন্ধ্যার পর পুরো সেতু এলাকা অন্ধকারে ডুবে থাকে। এই সুযোগে অসাধু চক্রের তৎপরতা বেড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, রাতের বেলায় সেতুতে মাদকসেবীদের আনাগোনা বাড়ছে, ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে। একই সঙ্গে অন্ধকারে যানবাহন চলাচলের সময় প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মাসুম ফকির দাবি করেন, নাদিম, রহিদ ও নেয়ামুল নামে তিন যুবক শুক্রবার রাতে সেতুর নিরাপত্তা রেলিংয়ের ২৪টি নাট-বল্টু খুলে নিয়ে যায়। পরে স্থানীয়দের তৎপরতায় নাট-বল্টুগুলো উদ্ধার করে তাদের জিম্মায় রাখা হয়েছে। তবে অভিযুক্তরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় বলে তিনি জানান।

এলাকাবাসীর ভাষ্য, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুতে ন্যূনতম আলোর ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তারা দ্রুত স্ট্রিট লাইট স্থাপন, সেতুতে নিয়মিত নিরাপত্তা টহল জোরদার এবং সরকারি সম্পদ চুরির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

সচেতন মহলের মতে, যথাযথ তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সরকারি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ও দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রাঙামাটি নদীর ওপর নির্মিত গোমা সেতুর দৈর্ঘ্য ২৮৩ দশমিক ১৮৮ মিটার। পিসি গার্ডার ও স্টিল ট্রাস প্রযুক্তিতে নির্মিত সেতুটির সঙ্গে প্রায় ১ দশমিক ৯০ কিলোমিটার অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ৬ দশমিক ৫১৮ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ, চারটি ৮ মিটার এবং একটি ৬ মিটার আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণ, নদীর দুই তীরে প্রায় ১১ হাজার ৮৬০ বর্গমিটার নদীশাসন এবং ৩১ হাজার ৮৮৬ বর্গমিটার এলাকায় কংক্রিট স্লোপ প্রটেকশন কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।

২০১৭ সালের ১৪ নভেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। শুরুতে এর ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫৭ কোটি ৬২ লাখ ১৫ হাজার টাকা। পরে নৌযান চলাচলের সুবিধার্থে সেতুর নকশা ও উচ্চতায় পরিবর্তন আনা হলে সংশোধিত ব্যয় দাঁড়ায় ৯২ কোটি ৪৪ লাখ ৮৯ হাজার টাকা।

এ বিষয়ে সওজ বরিশাল জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলাম বলেন, সেতুর মূল নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে এবং এটি উদ্বোধনও করা হয়েছে। বর্তমানে নিরাপত্তা রেলিং স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। ওই কাজের কিছু নাট-বল্টু চুরির ঘটনা ঘটেছে বলে আমরা জেনেছি। বিষয়টি তদন্তে আমাদের প্রতিনিধি ঘটনাস্থলে গেছেন।

তিনি আরও বলেন, সেতুর মূল প্রকল্পে স্ট্রিট লাইট স্থাপনের জন্য কোনো বরাদ্দ ছিল না। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ চেয়ে ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া মাত্রই সেতুতে স্ট্রিট লাইট স্থাপনের কাজ শুরু করা হবে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামো রক্ষায় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও আলোকসজ্জা নিশ্চিত করা হলে জনদুর্ভোগ কমবে এবং সেতুটি দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

বিএইচএস নিউজ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top