মায়ের দিকে তাকালে কি হজের সওয়াব পাওয়া যায়

রায়হান রাশেদ

অফিসের কলিগ শাহিদ ভাই প্রায়ই ভারমুখে বলেন, ‘ভাই, প্রতিদিন মোটরসাইকেল চালিয়ে অফিসে যাতায়াত করতে ভালো লাগে না। প্রতিদিন যেভাবে রোড এক্সিডেন্টে মানুষ মারা যায়; ভয় লাগে। আজকাল নিজের জন্য বেশ মায়া লাগে।’

আমাদের সিনিয়র হাসান ভাই বললেন, ‘ভয় নেই। আপনার আম্মা তো জীবিত আছেন, আন্টিরে বলবেন, তিনি যেন নিয়মিত দোয়া করেন। আমি বলে দিলাম, যতদিন আপনার আম্মা পৃথিবীতে আছেন, বড় কোনো দুর্ঘটনায় পড়বেন না।’

আমার দিকে মুখ করে বললেন, ‘জানেন, মায়ের সঙ্গে কথা হলেই তিনি বলেন, সাবধানে চলাফেরা করিস। গাড়ি দেখে পথ চলিস। আমি মাকে বলি, আপনি শুধু দোয়া করবেন। আপনি থাকতে আমার কিছু হবে না, মা। মা-বাবা যে কত বড় নেয়ামত; আমরা এটা বুঝি না। মাকে কত করে বললাম, শহরে আমার সঙ্গে থাকুন। তিনি রাজি হননি। গ্রাম নাকি তার ভালো লাগে। বাবার ঘর ছেড়ে তিনি কোথাও থাকতে পছন্দ করেন না। মাকে দেখতে মন ব্যাকুল হয়ে থাকে। জানেন তো মায়ের দিকে হাসিমুখে তাকালে কিন্তু হজের সওয়াব—এই বলে তিনি আমাকে নেট থেকে একটি হাদিস বের করে দেখালেন।

হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘মা-বাবার অনুগত সন্তান তাদের প্রতি দয়ামায়ার দৃষ্টিতে তাকালে আল্লাহ তাআলা প্রতিটি দৃষ্টির বিনিময়ে একটি করে কবুল হজের সওয়াব লিখে দেন। সাহাবিরা জানতে চাইলেন—হে আল্লাহর রাসুল, যদি প্রতিদিন শতবার তাকাই? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তবুও। আল্লাহ এর থেকে বেশি দাতা ও শ্রেষ্ঠ।’ (শুয়াবুল ইমান, হাদিস: ৭৪৭২; কানজুল উম্মাহ, হাদিস: ৪৫৫৩৫; মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস: ৪৯৪৪)

আমাদের সবার কি হজে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়? কিন্তু ঘরেই আমাদের হজ রয়েছে। সেই হজ মা-বাবা। তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ আর খুশির দৃষ্টির বিনিময়ে পাওয়া যায় কবুল হজের সওয়াব। পৃথিবীতে আর এমন কোনো জিনিস কি আছে? এমনকি কাবাঘর, এমনকি মসজিদে নববি!

শতবার তাকালে শত হজের সওয়াব মেলে। যাদের ঘরে পৃথিবীর সেরা এই নেয়ামত আছে, তাদের জীবন ধন্য। এ নেয়ামত কাজে লাগানো উচিত। যাদের নেই, তারা মা-বাবার জন্য সদকা করতে পারেন।

শতবার তাকালে শত হজের সওয়াব কেন; এর চেয়ে বেশিও দিতে পারেন দয়াময় আল্লাহ। মানুষ তার অবস্থান অনুযায়ী সওয়াব প্রত্যাশা করেন। আর আল্লাহ তাআলা কোনো কিছুর বিনিময় দেন তাঁর অবস্থান অনুযায়ী। এখানে একটি ঘটনা স্মরণ করা যেতে পারে।

বাদশাহ হারুনুর রশিদের কাছে এক ভিক্ষুক এলেন। সাহায্য চেয়ে দরবারে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন। প্রহরী ও মন্ত্রীরা এত সহজে অনুমতি দেন না। ভিক্ষুক খুব অনুনয়-বিনয় করলেন। দরবারে গেলেন। সালাম দিয়ে বললেন, জাহাঁপনা অনেক পথ পাড়ি দিয়ে আপনার কাছে এসেছি। আমি আপনার কাছে ১ দিনার ভিক্ষা চাই।

বাদশাহ বললেন, এত পথ পাড়ি দিয়ে আপনি আমার কাছে এসে মাত্র ১ দিনার চাইছেন। এ তো বড়ই আশ্চর্যের ব্যাপার। বাদশাহ মন্ত্রীকে বললেন, তাকে ১ হাজার দিনার দিয়ে দাও। মন্ত্রী আশ্চর্য হয়ে বললেন, ভিক্ষুক আপনার কাছে চাইল ১ দিনার, আপনি তাকে ১ হাজার দিতে বলছেন!

বাদশাহ বললেন, সে তার অবস্থান থেকে ১ দিনার চেয়েছে। তার কাছে ১ দিনারই অনেক বড় ব্যাপার। কিন্তু আমার অবস্থান থেকে ১ দিনার দিতে পারি না। আমার অবস্থান অনুযায়ী তাকে ১ হাজার দিনার দিলাম।

চিন্তা করুন, আল্লাহর অবস্থান কত বড়। আমরা আমাদের অবস্থান থেকে তাঁর কাছে প্রার্থনা করি। কিন্তু তিনি দেন তাঁর অবস্থান অনুযায়ী।

মা-বাবার অনুগত সন্তান তাদের প্রতি দয়ামায়ার দৃষ্টিতে তাকালে হজের সওয়াব পাওয়া যায়—এ হাদিসটিকে কেউ কেউ জাল বলেছেন। জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রহ.) বলেন, ‘হাদিসটি দুর্বল। (আল-জামেউস সগির, পৃষ্ঠা: ৮০৪৩)। শায়খ আলবানি (রহ.) এটিকে জইফ বা দুর্বল বলেছেন। (জইফুল জামে, পৃষ্ঠা: ৫১৮০)। ইসলামি বিশেষজ্ঞরা বলেন, হাদিসটি সনদের বিবেচনায় নিশ্চিতভাবেই দুর্বল। দুর্বল হাদিস ফজিলতের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য।

এশিয়া পোস্ট

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top