বিএসএফের গুলিতে তিন মাসে ৪ বাংলাদেশি নিহত

বরিশাল জার্নাল ডেস্ক

চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের হামলায় চারজন বাংলাদেশি নাগরিক নিহত ও ছয়জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে আন্তর্জাতিক সীমান্ত নীতি লঙ্ঘন করে উসকানিমূলকভাবে ভারতের অভ্যন্তর থেকে ২৯ জন বাংলাভাষী মানুষকে বাংলাদেশে জোরপূর্বক ‘পুশইন’ করা হয়েছে। এ ছাড়া একই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সহিংসতায় ২৭ জন নিহত, ২২৩ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার এবং ৫৬ জন সাংবাদিক নানাভাবে আক্রান্ত হয়েছেন।

শনিবার মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর প্রকাশিত ত্রৈমাসিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, সীমান্তে বিএসএফের গুলিবর্ষণ ও সহিংসতায় বাংলাদেশিদের প্রাণহানি অব্যাহত রয়েছে। মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার আহমেদাবাদ ইউনিয়নের চিমটিবিল, ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ এবং ফেনী সীমান্তে গুলি চালিয়ে এই হতাহতের ঘটনা ঘটায় বিএসএফ।

আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন ও মানবাধিকার সনদের অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘অপ্রত্যাবর্তন নীতি’ অলঙ্ঘনীয় হলেও বিএসএফ ভারত থেকে নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ ২৯ জন বাংলাভাষী মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ও সিমেন্টের খুঁটি নির্মাণের চেষ্টা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে গুলি ছুড়ে বালু ও পাথর উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত চারটি নৌকা ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়।

প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত তিন মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ২৭ জন নিহত এবং ১ হাজার ৯০ জন আহত হয়েছেন। এ সময়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা সংঘর্ষের ৪৫টি ঘটনায় চারজন নিহত ও ৪৮০ জন আহত হন। এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একটি এবং গণঅধিকার পরিষদের একটি অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে যথাক্রমে সাতজন ও ছয়জন আহত হন। পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশে হামলা ও বাধা দেওয়ার ঘটনাও অব্যাহত ছিল।

ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতার আশঙ্কাজনক চিত্র উঠে এসেছে। এই সময়ে মোট ২২৩ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন (১৫০ জন কন্যাশিশু ও ৭৩ জন নারী)। এর মধ্যে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪৪ জন (২৩ জন নারী ও ২১ জন শিশু) এবং ধর্ষণের পর ১০ জনকে হত্যা করা হয়েছে।

যৌতুকসংক্রান্ত সহিংসতায় ২৬ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে আটজনকে হত্যা করা হয় এবং চারজন আত্মহত্যা করেন। অন্যদিকে, পাসপোর্ট ও টিকিট থাকা সত্ত্বেও তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে ইমিগ্রেশন কর্তৃক বিদেশে যেতে বাধা দেওয়াকে সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে বর্ণিত অবাধ চলাচলের মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে সংস্থাটি।

পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এই সময়ে সাংবাদিকরা ব্যাপক নির্যাতন ও দমনপীড়নের শিকার হয়েছেন। ‘অধিকার’-এর তথ্যমতে, এই তিন মাসে ১ জন সাংবাদিক নির্যাতিত, ২২ জন আহত, ১৩ জন লাঞ্ছিত এবং ১৬ জন সরাসরি হুমকির শিকার হয়েছেন। শাসকদলের নেতাকর্মী, সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে এসব হামলার অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে কারাগারে মোট ৩০ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ২৯ জন ‘অসুস্থতাজনিত’ এবং একজন নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া নিম্ন আদালত কর্তৃক এই সময়ে ৮৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই বা ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে গণপিটুনিতে ২২ জন নিহত হয়েছেন। জ্বালানি সংকট ও বকেয়া বেতনের অসন্তোষের মধ্যে আশুলিয়ার প্রীতি গ্রুপ কারখানায় আগুনে ৭ জন নিহত ও ১৫ জন আহত হন এবং সীতাকুণ্ডে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ জন শ্রমিকের মৃত্যু ও ৩০ জন আহত হন।

‘অধিকার’-এর পর্যালোচনায় র‍্যাবের পরিবর্তে নতুন বিল পাসের মাধ্যমে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ গঠন এবং ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’, ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬’ ও ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে মানবাধিকার কমিশন আইনে আন্তর্জাতিক ‘প্যারিস নীতিমালা’ অনুসরণ না করায় এটি সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

দেশের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি উত্তরণে অধিকার বেশ কিছু সুপারিশ পেশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—প্যারিস নীতিমালার আলোকে মানবাধিকার কমিশন আইন সংশোধন, গুমের সঠিক তদন্ত ও ভিকটিম পরিবারকে আইনি প্রতিকার প্রদান, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতন বন্ধ, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ এবং সীমান্ত হত্যা বন্ধে সরকারের কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ।

আমার দেশ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top