ব্যাংকের কর্মচারীই এঁকেছিলেন ‘ছিনতাইয়ের’ ছক

বরিশাল জার্নাল ডেস্ক

নওগাঁর রাণীনগরে ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট শাখার ৩৪ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের নেপথ্যে ছিলেন ওই শাখারই অফিস সহায়ক রাসেল বাবু। অনলাইন জুয়ায় লাখ লাখ টাকা হারিয়ে ব্যাংকের টাকা আত্মসাতের ফাঁদ পাতেন তিনি। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করেন শাখার আরও দুই কর্মী। ছিনতাইয়ের নাটক সাজিয়ে নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করলেও প্রকৃতপক্ষে লোহার পাইপের আঘাতে রক্তাক্ত হন ক্যাশিয়ার নাজমুল। এ ঘটনায় ব্যাংকের তিন কর্মীসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। উদ্ধার হয়েছে ছিনতাই হওয়া মাত্র ১ লাখ ৪২ হাজার টাকা।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নওগাঁর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম।

পুলিশ জানায়, গত ৬ অক্টোবর দুপুরে ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট শাখার ক্যাশিয়ার নাজমুল ও অফিস সহায়ক রাসেল বাবু আদমদীঘি রেলগেট থেকে ৩৪ লাখ টাকা নিয়ে শাখার মালিক ফিরোজ হোসেনের আবাদপুকুর বাজার শাখার উদ্দেশে মোটরসাইকেলে রওনা হন। বেলা ১টার দিকে রাণীনগর উপজেলার পারইল বাজার পার হয়ে বাংলালিংক টাওয়ারের সামনে পৌঁছালে পেছন থেকে আরেকটি মোটরসাইকেলে আসা কয়েকজন তাদের পথরোধ করেন। পরে লোহার রড দিয়ে মারধর করে টাকা নিয়ে পালিয়ে যান তারা।

ঘটনার পরপরই তদন্তে নামে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও রাণীনগর থানা-পুলিশ। রাত ১১টা থেকে তদন্তের মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তির সহায়তায় প্রথমে দুই সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করা হয়। ঘটনার দিন রাতেই অভিযান চালিয়ে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত নিবন্ধনহীন মোটরসাইকেলটি জব্দ এবং এর মালিক রাব্বি আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পরদিন ৭ অক্টোবর রাতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি বিশেষ দল জয়পুরহাটের আক্কেলপুর ও দিনাজপুরে অভিযান চালায়। দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে স্বপন ও হাসান আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ছিনতাই হওয়া ১ লাখ ৪২ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৮ অক্টোবর রাণীনগরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ব্যাংকের আরও তিন কর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন রাণীনগর উপজেলার বিশিয়া গ্রামের আব্দুল জব্বারের ছেলে স্বপন (২৮), একই গ্রামের ওয়াজেদের ছেলে হাসান আলী (২৫), অলংকারদিঘি গ্রামের ইদ্রিস আলীর ছেলে সুজন (২৭), সিমলাদার গ্রামের আব্দুল ওহাবের ছেলে আবু তালেব (২২), অলংকারদিঘি গ্রামের আব্দুল মজিদের ছেলে রাসেল বাবু (২২) এবং মোটরসাইকেলটির মালিক রাব্বি আলী।

অনলাইন জুয়ায় ৭-৮ লাখ টাকা হারিয়ে পরিকল্পনা

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, ব্যাংকের অফিস সহায়ক রাসেল বাবু, কর্মকর্তা সুজন ও আবু তালেব কয়েক মাস ধরে অনলাইন জুয়ায় অংশ নিয়ে প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা হারান। বিভিন্ন গ্রাহকের টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে জুয়ায় ব্যবহার করেও তারা তা হারিয়ে ফেলেন। এরপর ব্যাংকের মালিক ফিরোজ হোসেনের টাকা ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেন তারা। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্বপন, হাসান আলীসহ আরও কয়েকজনকে যুক্ত করা হয়। এ নিয়ে প্রায় এক মাস ধরে প্রস্তুতি চলে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘটনার দিন রাসেল বাবু ক্যাশিয়ার নাজমুলকে সঙ্গে নিয়ে টাকা আনতে যান। ফেরার পথে তিনি স্বপন, হাসানসহ পলাতক সহযোগীদের নিজেদের অবস্থান জানাতে থাকেন। তারা নির্ধারিত স্থানে পৌঁছালে ছিনতাইকারীরা দুজনকে আটকে মারধর করে টাকা নিয়ে পালিয়ে যান।

পুলিশ সুপার বলেন, ক্যাশিয়ার নাজমুলই ছিলেন প্রকৃত ভুক্তভোগী। তাকে লোহার পাইপ দিয়ে মারধর করা হয়। অন্যদিকে, পুরো ঘটনাকে ছিনতাইয়ের রূপ দিতে অফিস সহায়ক রাসেল বাবু নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করেন।

১০ লাখ টাকা পাওয়ার কথা ছিল ব্যাংকের তিন কর্মীর

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ছিনতাই হওয়া ৩৪ লাখ টাকার মধ্যে ব্যাংকের তিন কর্মীর ১০ লাখ টাকা পাওয়ার কথা ছিল। বাকি টাকা অন্য সহযোগীদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। এর মধ্যে স্বপন ও হাসানকে প্রাথমিকভাবে দেড় লাখ টাকা দেওয়া হয় এবং নওগাঁ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বলা হয়। পরে তারা জয়পুরহাট হয়ে দিনাজপুরে চলে যান।

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার। ছিনতাই হওয়া ৩৪ লাখ টাকার মধ্যে এখন পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার টাকা।

ক্ষতিগ্রস্ত আবাদপুকুর ইসলামী ব্যাংক এজেন্ট শাখার স্বত্বাধিকারী ফিরোজ হোসেন বলেন, বিশ্বাস করে অভিযুক্তদের চাকরি দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তারাই তার বড় ধরনের ক্ষতি করেছেন।

পুলিশ দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করায় পুলিশ সুপারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ফিরোজ হোসেন বলেন, ছিনতাই হওয়া বাকি টাকা দ্রুত উদ্ধারে তিনি পুলিশের সহযোগিতা চান। টাকা উদ্ধার না হলে তাকে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

কালবেলা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top