জাহাঙ্গীর আলম হৃদয়
নদীর বুকে তখন জীবনের নতুন অধ্যায় রচনার সময়। ডিমভরা মা ইলিশ ছুটে চলে প্রজননক্ষেত্রের দিকে। তার শরীরে শুধু একটি মাছের ভবিষ্যৎ নয়, লুকিয়ে থাকে অসংখ্য নতুন প্রাণের সম্ভাবনা, নদীর জীববৈচিত্র্য এবং হাজারো জেলে পরিবারের জীবিকার আশা।
মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে প্রতিবছর নির্ধারিত সময়ে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হচ্ছে। এ সময় নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত এলাকায় ইলিশ আহরণসহ প্রজ্ঞাপনে নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখার বিধান রয়েছে।
এই ২২ দিন তাই শুধু মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা নয়; এটি ভবিষ্যৎ মৎস্যসম্পদ রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আইন যখন মা ইলিশকে নিরাপদে প্রজননের সুযোগ দিতে সক্রিয়, তখন কিছু মানুষ কেন সেই আইন অমান্য করে নদীতে নামছে? আর নিষিদ্ধ সময়ে আহরিত মাছের বাজারই বা তৈরি করছে কারা?
নদীতে জাল, তীরে অবৈধ বাজার
স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে, বছরের অন্য সময়ে বিভিন্ন পেশায় থাকা কিছু মানুষ নিষেধাজ্ঞার সময় এলাকায় ফিরে মাছ ধরায় যুক্ত হয়। কেউ কেউ এই কয়েক দিনকে দ্রুত অর্থ উপার্জনের সুযোগ হিসেবে দেখেন।
তবে শুধু জেলেকে দায়ী করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নিষিদ্ধ মাছের পেছনে যদি নৌকা, জাল, অর্থের জোগানদাতা, মাছ সংগ্রহকারী, পরিবহনকারী, মজুতকারী ও ক্রেতার একটি চক্র থাকে, তাহলে তাদেরও শনাক্ত করা জরুরি।
রাতের আঁধারে মাছ ধরা, গোপনে মাছ সরিয়ে নেওয়া কিংবা পরিচিত ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডের অভিযোগ থাকলে সেগুলো যথাযথভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী না বানিয়ে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। কারণ নদীতে জাল ফেলা বন্ধ করলেও যদি তীরে অবৈধ মাছের ক্রেতা থাকে, তাহলে সেই অপরাধের অর্থনৈতিক ভিত্তি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়।
আইনের চোখে নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ
মা ইলিশ রক্ষার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা শুধু দায়িত্বহীনতা নয়; এটি প্রযোজ্য আইন ও সরকারি প্রজ্ঞাপন লঙ্ঘনের বিষয়। Protection and Conservation of Fish Act, 1950-এর সংশ্লিষ্ট সংশোধিত বিধান অনুযায়ী সাধারণ নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
এ ছাড়া কারেন্ট জাল তৈরি, আমদানি, বাজারজাতকরণ, মজুত, বহন, পরিবহন, দখল বা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পৃথক শাস্তির বিধান রয়েছে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী কারেন্ট জাল তৈরি, আমদানি, বাজারজাতকরণ বা মজুতের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে।
অর্থাৎ ‘কয়েকটি মাছ ধরেছি’, ‘নিজের খাওয়ার জন্য নিয়েছি’ কিংবা ‘পরিচিত কাউকে বিক্রি করেছি’—এমন যুক্তি দিয়ে নিষেধাজ্ঞাকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কোন কর্মকাণ্ডে কী শাস্তি প্রযোজ্য হবে, তা আইন ও মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে।
আইন মানার দায়িত্ব সবার
আইন প্রয়োগ করবে প্রশাসন—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একটি নিষেধাজ্ঞা তখনই সফল হয়, যখন সাধারণ মানুষও সেটিকে নিজেদের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করে।
একজন জেলে যদি নিষিদ্ধ সময়ে নদীতে না নামেন, ব্যবসায়ী যদি নিষিদ্ধ মাছ না কেনেন এবং ক্রেতা যদি সেই মাছের চাহিদা তৈরি না করেন, তাহলে অবৈধ চক্রের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে যায়। তাই শুধু নদীতে অভিযান নয়; বাজার, আড়ত, পরিবহন ও সম্ভাব্য মজুতস্থলেও নজরদারি প্রয়োজন। পাশাপাশি স্থানীয় মানুষকে সচেতন করে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর সুযোগ তৈরি করা দরকার।
ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টিতে সংযম
ইলিশ খাওয়াকে ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ বলা এই আলোচনার বিষয় নয়। মূল বিষয় হলো—আইন মানা, অন্যের ক্ষতি না করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ করা। ইসলামের নৈতিক শিক্ষায় দায়িত্বশীলতা, অপচয় পরিহার এবং সমাজের কল্যাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই দৃষ্টিতে আইনসম্মতভাবে মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণের উদ্যোগকে নৈতিক দায়িত্ব ও সামাজিক কল্যাণের জায়গা থেকেই দেখা যায়।
এই ২২ দিন ইলিশ না খেলেও মানুষের জীবন থেমে থাকবে না। বিকল্প মাছ ও অন্যান্য খাবার দিয়ে প্রয়োজন মেটানো সম্ভব। কিন্তু একটি মা ইলিশ নিরাপদে ডিম ছাড়ার সুযোগ পেলে তার সুফল ভবিষ্যতের মৎস্যসম্পদে ফিরে আসতে পারে।
ক্ষণিকের লাভ নয়, ভবিষ্যতের সম্পদ
কয়েক দিনের নিষেধাজ্ঞা ভেঙে কেউ হয়তো সাময়িক অর্থ উপার্জন করতে পারেন। কিন্তু একটি মা ইলিশের প্রজনন ব্যাহত হলে ক্ষতির পরিমাণ শুধু একটি মাছের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ভবিষ্যতের ইলিশ, জেলেদের আয়, বাজারব্যবস্থা এবং দেশের মৎস্যসম্পদের স্বার্থ। তাই সাময়িক লাভের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদকে গুরুত্ব দিতে হবে।
দরকার সমন্বিত উদ্যোগ
মা ইলিশ রক্ষায় প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রতিনিধি, বাজার কমিটি, জেলে প্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত ভূমিকা জরুরি।
একদিকে যেমন প্রকৃত জেলেদের জন্য নির্ধারিত সহায়তা যথাযথভাবে পৌঁছানো দরকার, অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞার সুযোগ নিয়ে যারা পরিকল্পিতভাবে অবৈধ মাছ আহরণ, পরিবহন, মজুত বা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত, তাদের তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
কারণ মা ইলিশ রক্ষা শুধু নদীতে অভিযান চালানোর বিষয় নয়। এটি আইনের যথাযথ প্রয়োগ, মানুষের দায়িত্ববোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ মৎস্যসম্পদ রেখে যাওয়ার সম্মিলিত অঙ্গীকার।
লেখক : সাংবাদিক




