গর্ভকাল থেকে শিশুর পাশে—সরকারের সুরক্ষার হাত

জাহাঙ্গীর আলম হৃদয়

গর্ভের সন্তানকে ঘিরে একজন মায়ের স্বপ্নের শেষ নেই। অনাগত শিশুর সুস্থতা, নিজের পুষ্টি ও চিকিৎসা—সবকিছুর চিন্তা একসঙ্গে ভর করে তার মনে। কিন্তু আর্থিক সংকটে সেই স্বপ্ন অনেক সময় কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। বিশেষ করে প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারের গর্ভবতী নারীদের জন্য গর্ভকাল হয়ে ওঠে বাড়তি দুশ্চিন্তার সময়।

এই দুশ্চিন্তা কিছুটা হলেও লাঘব করতে সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’। আগে যা ‘মাতৃত্বকালীন ভাতা’ নামে পরিচিত ছিল, সেই কর্মসূচি এখন গর্ভবতী মা ও শিশুর প্রাথমিক সময়ের সামাজিক সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

গর্ভকাল থেকেই সহায়তার হাত

একজন মা যখন গর্ভধারণ করেন, তখন থেকেই শুরু হয় নতুন জীবনের অপেক্ষা। এই সময় মায়ের প্রয়োজন পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা। কিন্তু দরিদ্র পরিবারের অনেক নারীর জন্য এসব নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’ সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের নারীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। কর্মসূচির আওতায় একজন নির্বাচিত ভাতাভোগী মা প্রতি মাসে ৮০০ টাকা করে সহায়তা পান।

৩৬ মাসের সহায়তা

শুধু গর্ভকাল নয়, শিশুর জন্মের পর তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক সময়কেও বিবেচনায় রাখা হয়েছে এ কর্মসূচিতে। গর্ভাবস্থা থেকে শিশুর ২ বছর বয়স পর্যন্ত মোট ৩৬ মাস এই সহায়তা অব্যাহত থাকে।

পুরো মেয়াদে একজন সুবিধাভোগী মা সর্বমোট ২৮ হাজার ৮০০ টাকা আর্থিক সহায়তা পেতে পারেন। একজন দরিদ্র মায়ের কাছে এই অর্থ গর্ভকালীন পুষ্টি, প্রয়োজনীয় ওষুধ কিংবা শিশুর দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হয়ে উঠতে পারে।

মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি মায়ের হাতে

সরকারি সহায়তা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ডিজিটাল ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’র অর্থও G2P (Government to Person) পদ্ধতিতে সরাসরি সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা রয়েছে।

ফলে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভর করতে হয় না। সুবিধাভোগীর নিজের নামে থাকা বিকাশ, নগদ বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অর্থ পৌঁছে যেতে পারে।

কারা পাবেন এই সুবিধা?

প্রকৃত দরিদ্র ও প্রয়োজনীয় নারীদের কাছে সুবিধাটি পৌঁছে দিতে কর্মসূচিতে নির্দিষ্ট যোগ্যতার শর্ত রয়েছে।

সাধারণভাবে—

– গর্ভবতী নারীর বয়স কমপক্ষে ২০ বছর হতে হবে।
– প্রথম বা দ্বিতীয় গর্ভধারণের ক্ষেত্রে এ সুবিধা প্রযোজ্য।
– আবেদনকারীকে দরিদ্র, নিম্নআয়ের অথবা ভাসমান পরিবারের নারী হতে হবে।
– একই সময়ে অন্য কোনো সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধিনিষেধ রয়েছে।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

আবেদনের সময় সাধারণত প্রয়োজন হয়—

– জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) কপি;
– কমিউনিটি ক্লিনিক বা সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের গর্ভধারণ সংক্রান্ত সনদ;
– আবেদনকারীর নিজের নামে নিবন্ধিত সচল মোবাইল নম্বর;
– বিকাশ, নগদ বা ব্যাংক হিসাবের তথ্য;
– সদ্য তোলা পাসপোর্ট সাইজের ছবি।

আবেদন থেকে যাচাই—তারপর চূড়ান্ত তালিকা

সুবিধাভোগী নির্বাচনের প্রক্রিয়াটিও ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা হয়। নির্ধারিত সময়ে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট অনলাইন ব্যবস্থায় আবেদন করতে হয়। আবেদন সম্পন্ন হওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদনপত্রের প্রিন্ট কপি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা কার্যালয়ে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

এরপর উপজেলা বা পৌর পর্যায়ের যাচাই-বাছাই কমিটি আবেদনকারীর তথ্য মাঠপর্যায়ে যাচাই করে। যোগ্যতা ও তথ্য যাচাই শেষে প্রস্তুত করা হয় চূড়ান্ত তালিকা।

শুধু ভাতা নয়, নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রত্যাশা

একজন মায়ের সুস্থতা মানেই একটি শিশুর নিরাপদ শৈশবের সম্ভাবনা। আর একটি সুস্থ শিশুই আগামী দিনের সুস্থ ও কর্মক্ষম নাগরিক।

তাই ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’কে শুধু একটি আর্থিক সহায়তা হিসেবে দেখলে এর মূল উদ্দেশ্যটি পুরোপুরি উপলব্ধি করা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুর পুষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা এবং একটি পরিবারের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা।

একজন মা যখন গর্ভাবস্থায় সামান্য হলেও আর্থিক নিশ্চয়তা পান, তখন সেই সহায়তা তার কাছে হয়ে ওঠে বড় ভরসা। শিশুর জন্মের পরও সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে নতুন জীবনের পথচলাটাও হয় কিছুটা সহজ।

একজন মায়ের নিরাপদ মাতৃত্বের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে একটি শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ। আর সেই ভবিষ্যৎকে আরও নিরাপদ করতে গর্ভকাল থেকেই মায়ের পাশে সরকারের এই সহায়তা হয়ে উঠতে পারে নতুন আশার আলো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top