বরিশাল জার্নাল ডেস্ক
দলের প্রধান ডা. শফিকুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী করে অনেকটা গোপনেই ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ বা ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’ গঠন করেছে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
এতদিন ছায়া মন্ত্রিসভার কার্যক্রম অনেকটা আড়ালে রাখা হলেও শিগগির এর সদস্যদের আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জামায়াত। গতকাল সোমবার রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান বিষয়টি জানিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, তারা এরই মধ্যে একটি ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। এর সদস্যদের প্রশিক্ষণ চলছে। শিগগির আনুষ্ঠানিকভাবে ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম প্রকাশ করা হবে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান আইনজীবী এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেছেন, নির্বাহী কমিটিতে যারা আছেন, তাদের সিদ্ধান্তে গত মাসে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে এটি প্রকাশ করা হবে।
কারা এই মন্ত্রিসভায় রয়েছেন— জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে। সংগঠনের অনেক সিনিয়র নেতা, যারা সংসদ সদস্য নন, তারাও এই কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত আছেন। মূলত সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনতেই এটি গঠন করা হয়েছে।
তবে দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ছায়া মন্ত্রিসভায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন দলের সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন জামায়াতের নায়েবে আমির ও রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান। তথ্য মন্ত্রণালয়ে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রচার বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন এবং আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।
এ ছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ফরিদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা, ধর্ম মন্ত্রণালয়ে শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ রাশেদুল ইসলাম এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি সালাহউদ্দিন আইয়ুবী রয়েছেন বলে জানা গেছে।
জামায়াতের দাবি সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ, সরকারি সিদ্ধান্তের বিকল্প নীতিপ্রস্তাব তৈরি এবং সংসদে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই এই মন্ত্রিসভা গঠন করেছে তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলটির শীর্ষ কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, গত মাসে গোপনে এই ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম, বাজেট ও সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনায় কাজ করেছে ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্যরা।
আগে জোটগতভাবে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের চিন্তা থাকলেও শেষ পর্যন্ত দলীয়ভাবেই এই কাঠামো তৈরি করেছে জামায়াত। এতে দলের শীর্ষ নেতা, সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সাবেক ছাত্রশিবির নেতাদের যুক্ত করা হয়েছে। সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে একজন করে ছায়া মন্ত্রী রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ভিত্তিক একটি টিমও কাজ করবে। প্রয়োজনে উপমন্ত্রী পর্যায়েও দায়িত্ব বণ্টন করা হবে বলে জানিয়ে জামায়াত।
জামায়াতের নেতারা বলছেন, এই ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের মূল লক্ষ্য তিনটি— সরকারের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা, সরকারের ভুল বা দুর্বলতা চিহ্নিত করে বিকল্প পথ দেখানো এবং ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ নেতৃত্ব ও সম্ভাব্য মন্ত্রী তৈরি করা। অর্থাৎ শুধু বিরোধিতা নয়, সরকার পরিচালনার বিকল্প প্রস্তুতিও এই কাঠামোর অন্যতম উদ্দেশ্য।
ছায়া মন্ত্রিসভার কার্যক্রম ব্যাখ্যা করে জামায়াতের শীর্ষ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেছেন, গঠনমূলক গণতান্ত্রিক রাজনীতি রয়েছে, এমন দেশগুলোয় বিরোধী দল সরকার গঠিত মন্ত্রিসভার পাশাপাশি একটি প্যারালাল বা ছায়া মন্ত্রিপরিষদ গঠন করে। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, গঠনমূলক সমালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হয়।
ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. স ম আলী রেজা বললেন, পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রে ছায়া মন্ত্রিসভা কোনো নতুন ধারণা নয়; শক্তিশালী নাগরিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি রয়েছে— এমন দেশগুলোয় এটি প্রতিষ্ঠিত চর্চা। তার মতে, ছায়া মন্ত্রিসভা সরকারের ওপর একধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করে এবং বিরোধী দলকে গঠনমূলক সমালোচনার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দেয়। সরকার বাজেট বা বড় কোনো নীতি প্রস্তাব দিলে সংশ্লিষ্ট ছায়া মন্ত্রীরাও বিকল্প বাজেট বা নীতিপ্রস্তাব জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারেন। এতে তুলনামূলক আলোচনা তৈরি হবে এবং সরকারও প্রয়োজনীয় বিষয় গ্রহণের সুযোগ পাবে।
আগামীর সময়




