এ যেন ‘ছুটির ঘণ্টা’ সিনেমা, বাথরুমে আটকে ছিল শিশু

বরিশাল জার্নাল ডেস্ক

১৯৮০ সালে মুক্তি পাওয়া শিশুতোষ সিনেমা ‘ছুটির ঘণ্টা’ দেখে কাঁদেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। ঈদের ছুটি ঘোষণার দিন স্কুলের বাথরুমে সবার অজান্তে তালাবন্ধ হয়ে আটকে পড়ে ১২ বছরের শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে কেঁদে বুক ভাসিয়েছে দর্শক। সিনেমায় দীর্ঘ ১১ দিনের ছুটি শেষ হওয়ার পর শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অনেকটা একই রকম ঘটনা ঘটল মেহেরপুরে। কিন্তু ভাগ্য সহায় হওয়ায় বাথরুমে আটকা শিশুটিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।

 

বুধবার (১৫ এপ্রিল) মেহেরপুর শহরের বিএম মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে।

 

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এদিন বিকাল চারটার দিকে যথারীতি স্কুল ছুটি ঘোষণা করা হয়। শিক্ষার্থীরা একে একে বাড়ির পথে রওনা দিলেও অজান্তেই বাথরুমের ভেতরে আটকা পড়ে যায় সাদিয়া (৮)। এদিকে শিক্ষকরা পুরো স্কুল ভবন ও মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে চলে যান। নিঃসঙ্গ বিদ্যালয় ভবনে বন্দি হয়ে পড়ে ছোট্ট শিশুটি। সময় যত গড়াতে থাকে, ততই ভয় তাকে গ্রাস করে। শুরু হয় বুকফাটা কান্না, অসহায় চিৎকার, যা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে স্কুলের আশপাশে। অবশেষে সেই আর্তনাদ কানে আসে পথচারীদের। সন্দেহ জাগে, ছুটে আসেন স্থানীয়রা।

 

এদিকে নির্ধারিত সময় পেরিয়েও মেয়ে বাড়ি না ফেরায় উদ্বেগে অস্থির হয়ে পড়েন সাদিয়ার বাবা পুরাতন পোস্ট অফিস পাড়ার বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম। খোঁজ নিতে গিয়ে তিনিও যুক্ত হন স্থানীয়দের সঙ্গে। পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত উদ্যোগ নেয় এলাকাবাসী। তাদের চেষ্টায় খুলে ফেলা হয় স্কুলের মূল ফটক। কিন্তু ভেতরে ঢুকে নতুন বাধা বিদ্যালয় ভবনের কলাপসিবল দরজা! সেটি ভেঙে বা খুলে শিশুটির কাছে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছিল না। একদিকে সময় ফুরিয়ে আসছে, অন্যদিকে শিশুর কান্না আরও করুণ হয়ে উঠছে। চরম উৎকণ্ঠার মুহূর্তে স্থানীয়রা এক শিক্ষিকাকে খবর দেন। পরবর্তীতে এক ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার পর ঘটনাস্থলে পৌঁছান শিক্ষিকা লিনা ভট্টাচার্য। তার উপস্থিতিতে খোলা হয় দরজা, আর সেখান থেকেই উদ্ধার করা হয় আতঙ্কে কাঁপতে থাকা সাদিয়াকে। উদ্ধারের পর শিশুটিকে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় পাওয়া যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।

 

ঘটনাটি রাত সাড়ে ১১টার দিকে জানাজানি হলে গণমাধ্যমকর্মীরা বিদ্যালয়ের অফিসিয়াল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে মোবাইল ফোন কেটে দেন। পরবর্তীতে একাধিকবার ফোন করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি, যা আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা।

 

এদিকে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় রাত প্রায় ১২টার দিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন মেহেরপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খায়রুল ইসলাম। তিনি স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করেন এবং বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।

 

এ বিষয়ে ইউএনও খায়রুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘শিশুটি সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার হয়েছে। তবে ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।’

 

উল্লেখ্য, শুরুতেই বলা হয়েছে ‘ছুটির ঘণ্টা’র কথা। ১৯৮০ সালে নির্মিত এই জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে দেখা যায়, ঈদের ছুটি ঘোষণার দিন স্কুলের বাথরুমে অজান্তে তালাবদ্ধ হয়ে আটকে পড়ে এক ১২ বছর বয়সী ছাত্র। দীর্ঘ ১১ দিনের ছুটি চলাকালীন সেখানে বন্দি অবস্থায় তার করুণ পরিণতি ঘটে। টিফিন ও পানি খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা, দেয়ালে অনুভূতি লেখা—সবশেষে ছুটি শেষে স্কুল খোলার পর তার নিথর দেহ উদ্ধার হয়। পরে দপ্তরি আব্বাস মিয়া ঘটনার দায় নিজের কাঁধে নিয়ে কারাবরণ করেন। বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি আশির দশকে ব্যাপক আলোচিত ও দর্শকপ্রিয় ছিল। এশিয়া পোস্ট

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top