হত্যা করা হয়েছে তাহসিফকে, সন্দেহ বাবার

বরিশাল জার্নাল ডেস্ক

বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি হত্যার শিকার হয়েছেন বলে সন্দেহ করছেন তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। তার ধারণা, হত্যার পর তার লাশ হয়তো নদীতে ফেলে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।

আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে ছেলের লাশ বুঝে নেওয়ার সময় এসব কথা বলেন তাহসিফের বাবা।

গাজীপুরের টঙ্গী নদীবন্দর এলাকার নৌপুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. ফিরোজ উদ্দিন জানান, তাহসিফ সপরিবার উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন। গত মঙ্গলবার তিনি নিখোঁজ হন।

এ সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তাহসিফের বাবা। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল তিনি ছেলের মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে মনে করেন কি না। জবাবে এনায়েতুল করিম বললেন, ‘আত্মহত্যার প্রশ্নই আসে না। তাহসিফ অত্যন্ত প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিল।’

‘বিমানবাহিনীতে কমিশন্ড অফিসার হতে তাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। বিভিন্ন কোর্স সম্পন্ন করার পাশাপাশি উড্ডয়নেও সে ভালো ছিল,’ যোগ করেন তিনি।

এনায়েতুল করিম জানালেন, তাহসিফের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ। তাই ছেলের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে তিনি ধারণা রাখতেন। তার বিশ্বাস, তাহসিফ আত্মহত্যা করেননি।

এনায়েতুলের সন্দেহ হত্যার শিকার হয়েছে তার ছেলে। তার সন্দেহ, তাকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে কে বা কারা, কী কারণে এমন ঘটনা ঘটাতে পারে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি তাহসিফের বাবা।

সারাদিন ছিলেন মায়ের সঙ্গে, করেছেন কেনাকাটাও

এনায়েতুল জানালেন, নিখোঁজ হওয়ার আগে সারাদিন তাহসিফ ছিলেন তার মায়ের সঙ্গে। কেনাকাটা করেছেন তারা। এরপর সন্ধ্যায় এক ব্যক্তির ডাকে ঘর থেকে বের হন তিনি। আর ফেরেননি। পরদিন নদীতে মিলল লাশ।

ঘটনার দিনের বর্ণনা দিয়ে তাহসিফের বাবা বললেন, ‘সেদিন সারাদিনই মায়ের সঙ্গে ছিল তাহসিফ। মাকে নিয়ে কেনাকাটা করেছে। কেনাকাটা করেছিল আমার জন্যও।’

‘সন্ধ্যার দিকে দ্বীপ নামে এক ব্যক্তি তাকে ডাকে। তখন মাকে বলে যায়, দ্বীপের সঙ্গে কথা বলে আসবে। এরপর আর বাসায় ফেরেননি’, যোগ করেন এনায়েতুল করিম।

তাহসিফের কর্মজীবন সম্পর্কে তার বাবা জানান, তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও নেত্র নিউজের সঙ্গে কাজ করেছে। সবশেষ ভার্গ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসন ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিল। কয়েক দিন আগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হওয়ায় বিশ্রামে ছিল সে।

‘এমন ঘটনা ঘটতে পারে ভাবেনি কেউ’

বন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে বাসার বাইরে গিয়ে এমন ঘটনা ঘটতে পারে তা পরিবারের কেউই ভাবেনি বলে জানান তাহসিফের বাবা। তবে ছেলের মৃত্যুর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে সে বিষয়েও নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই তার কাছে।

এনায়েতুল করিম বললেন, ‘ঘটনার দিনও তাহসিফ মায়ের সঙ্গে কেনাকাটা করেছে। আমার জন্যও কেনাকাটা করেছিল। এরপর বন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে নিচে যাওয়ার কথা বলে বের হয়।’

‘স্বাভাবিকভাবে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার পর এমন ঘটনা ঘটবে, তা পরিবারের কেউ ভাবতে পারেননি’, যোগ করেন তাহসিফের বাবা।

তাহসিফের শরীরে ছিল না আঘাতের চিহ্ন

লাশ যখন উদ্ধার করা হয় তখন তাহসিফের শরীরে কোনো আঘাত ছিল না বলে উল্লেখ করা হয়েছে সুরতহাল প্রতিবেদনে। প্রতিবেদন তৈরি করেন টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির এসআই মোস্তাফিজুর রহমান।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মৃত ব্যক্তির উচ্চতা আনুমানিক ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি। মাথার চুল কালো, মুখে ছোট ছোট কালো দাড়ি ও গোঁফ ছিল। চোখ ও মুখ বন্ধ ছিল। নাক দিয়ে রক্ত বের হতে দেখা গেছে। তার দুই হাত মাথার সামনে বাঁকানো ও মুষ্টিবদ্ধ অবস্থায় ছিল। পেট ছিল ফোলা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুক, পেট, পিঠ, দুই পা ও যৌনাঙ্গ ছিল স্বাভাবিক। শরীরে পাওয়া যায়নি কোনো আঘাতের চিহ্ন। উদ্ধারের সময় তার পরনে কালো রঙের ফুলহাতা কাবলি শার্ট ও সাদা রঙের ট্রাউজার ছিল।

নৌ পুলিশের তাৎক্ষণিক প্রতিবেদনেও বলা হয়, মৃত ব্যক্তির হাতে একটি ঘড়ি ও পকেটে একটি আইফোন পাওয়া যায়। ফোনের মাধ্যমে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়।

সাবেক এ বিমান বাহিনী কর্মকর্তার মৃত্যুকে ঘিরে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও প্রকাশের ঘটনায় তাহসিফের নাম আলোচনায় এসেছিল।

মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তাহসিফের কলেজ ও বিএমএ-এর কোর্সমেট কেএসএম ইনতিসার ইনজিমাম তার ফেসবুক আইডিতে এক আবেগঘন পোস্ট দেন। পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘গত পরশু রাতে ঘর থেকে বের হওয়ার পর থেকে তাউসিফ নিখোঁজ ছিলেন।’ লাশের ছবিতে হাতে কাদা মাখা থাকলেও শরীরের বাকি অংশ পরিষ্কার ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ইনতিসার দাবি করেন, এটি যদি দুর্ঘটনা বা ব্যক্তিগত কোন্দল বলে পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত না হয়, তবে তিনি এটিকে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড হিসেবেই দেখছেন। তিনি আরও জানান, ৫ আগস্টের ভিডিও ফাঁসের পর তাহসিফ নানাভাবে মানহানির শিকার হলেও তার বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক পুলিশি মামলা ছিল না।

আগামীর সময়

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top