মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম হৃদয়, বিশেষ প্রতিনিধি
দক্ষিণাঞ্চলের প্রসিদ্ধ ও প্রাচীন বিদ্যাপীঠ ঐতিহ্যবাহী সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ। মুক্তচিন্তার চর্চা এবং ক্যাম্পাসের শিক্ষা ও সংবাদ পরিবেশনায় তরুণদের এক ছাতার নিচে আনার স্বপ্ন নিয়ে ২০০৫ সালের ২৪শে এপ্রিল যাত্রা শুরু করেছিল ‘বিএম কলেজ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন’ (বিএমসিজেএ)। ক্যাম্পাসে কোনো পেশাদার সাংবাদিক সংগঠন না থাকার দীর্ঘদিনের অভাববোধ থেকেই এর সূচনা, যা পরবর্তীতে বিএম কলেজের অন্যতম জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনে পরিণত হয়।

এক ভাবনার সূচনা ও প্রথম পদক্ষেপ
২০০৫ সালে আমি তখন বিএম কলেজে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাংবাদিকদের নিজস্ব সংগঠন থাকলেও ঐতিহ্যবাহী বিএম কলেজে তা ছিল না। এই শূন্যতা আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। সেই চিন্তা থেকে প্রথম বিষয়টি নিয়ে কথা বলি প্রিয় জিয়াউর রহমান (জিয়া ভাই)-এর সাথে। তিনি তখন বিএম কলেজের বাংলা বিভাগের ছাত্র, জাতীয় ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এর সংবাদ সরবরাহকারী এবং স্থানীয় ‘দৈনিক দক্ষিণাঞ্চল’-এর স্টাফ রিপোর্টার ছিলেন। আর আমি কাজ করতাম স্থানীয় ‘দৈনিক সত্য সংবাদ’ এবং তৎকালীন জনপ্রিয় জাতীয় দৈনিক ‘আজকের কাগজ’ পত্রিকায়।
আমরা দুজন মিলে ক্যাম্পাসে কর্মরত অন্য সাংবাদিকদের একত্রিত করার সিদ্ধান্ত নিই। সংগঠনের জন্য মূল শর্ত ছিল একটাই—সদস্যদের অবশ্যই বিএম কলেজের শিক্ষার্থী হতে হবে এবং জাতীয় বা স্থানীয় দৈনিকে ক্যাম্পাস প্রতিনিধি বা স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত থাকতে হবে।
জ্যেষ্ঠদের সংমিশ্রণ ও প্রথম আহ্বায়ক কমিটি
জিয়া ভাই ও আমি ব্যাপক যোগাযোগ ও প্রচার- প্রচারণা শুরু করি। অনুসন্ধানের একপর্যায়ে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আযাদ আলাউদ্দীন ভাইয়ের সাথে আমাদের কথা হয়। তিনি আমাদের উদ্যোগটি সানন্দে গ্রহণ করেন এবং সাংবাদিক জাকিরুল আহসান, মিজানুর রহমান পলাশ, নিকুঞ্জবালা পলাশ, আরিফুর রহমান, আসাদুর রহমানসহ অনেকের সাথে আলোচনা করেন।
সকলের সর্বসম্মতিক্রমে ২০০৫ সালের ২৪শে এপ্রিল আযাদ আলাউদ্দীনকে আহ্বায়ক করে ১১ সদস্যবিশিষ্ট প্রথম আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে এই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় আমিও সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলাম। প্রথম কমিটির শেষভাগে এসে আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রমে যুক্ত হন সাংবাদিক আহমেদ বায়েজীদ।

প্রথম পূর্ণাঙ্গ কমিটি ও সাংগঠনিক বিস্তার
আহ্বায়ক কমিটির সফল পরিক্রমার পর একটি শক্তিশালী পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ কাউকে নেতৃত্বে আনার চিন্তাভাবনা থেকে তৎকালীন ‘দৈনিক আমার দেশ’ পত্রিকায় কর্মরত মাসুম মিজান ভাইকে যুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে প্রত্যক্ষ ভোটে মাসুম মিজানকে সভাপতি এবং আযাদ আলাউদ্দীনকে সাধারণ সম্পাদক করে বিএমসিজেএ-এর প্রথম পূর্ণাঙ্গ কমিটি আত্মপ্রকাশ করে।
পরবর্তীতে সংগঠনের দ্বিতীয় কমিটি গঠিত হয়। এতে সভাপতি নির্বাচিত হন তাওহীদ সৌরভ এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম হৃদয় (আমি)।
গৌরবোজ্জ্বল অর্জন ও ঐতিহাসিক ভূমিকা
শুরু থেকেই বিএমসিজেএ ক্যাম্পাস প্রশাসন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কালজয়ী ও অভাবনীয় বেশ কিছু দৃষ্টান্ত স্থাপন করে:
* বাকসুর সাথে ঐতিহাসিক সংবাদ সম্মেলন: তৎকালীন বিএম কলেজ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (বাকসু)-এর সাথে বিএমসিজেএ প্রথম যৌথ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে, যা ক্যাম্পাসের ইতিহাস ও সাংবাদিকতার ধারায় ছিল একটি অভূতপূর্ব ঘটনা।
* দুর্নীতিমুক্ত ভর্তি প্রক্রিয়া: সে সময়ে ভর্তি সংক্রান্ত অনিয়ম রোধে তৎকালীন সম্মানিত অধ্যক্ষ প্রফেসর নাজমউদ্দিন আহমেদ বিএমসিজেএ নেতাদের সহযোগিতা চান। সংগঠনের কঠোর নজরদারি ও প্রত্যক্ষ সহায়তায় বিএম কলেজে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
* নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব ক্যাম্পাস গঠন: ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের অবৈধ প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি, চারপাশে নিরাপত্তা গেটগুলো শক্তিশালীকরণ, মাদক আড্ডা বন্ধ এবং ধূমপানমুক্ত ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে বিএমসিজেএ জোরালো ভূমিকা রাখে। এছাড়া রাতে শিক্ষার্থীরা যাতে নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে সে জন্য পর্যাপ্ত লাইটিংয়ের ব্যবস্থা এবং ক্যাম্পাস পরিচ্ছন্ন রাখার কর্মসূচিতেও সংগঠনটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
* সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ কর্মশালা: বেসরকারি সংস্থা ‘নাগরিক উদ্যোগ’-এর সহায়তায় বিএমসিজেএ একটি বড় আকারের সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করে। এতে তরুণ ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার্থীরাও অংশ নিয়ে সাংবাদিকতার মৌলিক পাঠ গ্রহণ করে।
* নিজস্ব কার্যালয় ও ঐতিহ্যবাহী ‘মুক্তমঞ্চ’: দ্বিতীয় কমিটির সভাপতি তাওহীদ সৌরভ ভাইয়ের স্বপ্ন ছিল সাংবাদিকদের কাজের জন্য নিজস্ব স্থান তৈরির—যেখানে বসে সাংবাদিকরা সংবাদ প্রস্তুত করবে, চা খাবে এবং ক্যাম্পাস রাজনীতি ও সাহিত্য নিয়ে ভাববে। সেই ভাবনা থেকেই অফিস বরাদ্দের আবেদন করা হয়। কলেজ কর্তৃপক্ষ ক্যান্টিন ভবনের পেছন দিকের একটি কক্ষ বরাদ্দ দেয়। শুধু তাই নয়, ঘরের সামনে তৈরি করা হয় ঐতিহ্যবাহী ‘মুক্তমঞ্চ’, যা পরবর্তীতে বিএম কলেজের সকল সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মেধা চর্চার মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়।
প্রকাশনা ও সাহিত্য চর্চায় বিএমসিজেএ
সংবাদ পরিবেশনার পাশাপাশি ক্যাম্পাসের সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশ ও প্রকাশনাতেও বিএমসিজেএ-এর প্রত্যক্ষ অবদান ও সার্বিক তত্ত্বাবধান ছিল:
* ‘এক নজরে ক্যাম্পাস’: বিএমসিজেএ-এর তত্ত্বাবধানে শামীম আজাদের সম্পাদনায় ‘এক নজরে ক্যাম্পাস’ নামে একটি তথ্যবহুল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়।
* ‘বন্ধু সাহিত্য পরিষদ’: বিএমসিজেএ-এর তিন সক্রিয় সদস্য জাহাঙ্গীর আলম হৃদয়, আবু ইউসুফ সোহাগ ও আহমেদ বায়েজীদ—এই তিনজনের উদ্যোগ ও যৌথ প্রকাশনায় ‘বন্ধু সাহিত্য পরিষদ’ নামে একটি অনন্য ম্যাগাজিন আত্মপ্রকাশ করে, যা ক্যাম্পাসের তরুণ লেখকদের দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
স্থবিরতা, পুনর্গঠন ও বর্তমান বিএমসিজেএ
দ্বিতীয় কমিটির সফল মেয়াদের পর মাঝে বেশ কয়েক বছর সংগঠনের কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসে। দীর্ঘ বিরতির পর সংগঠনটি আবার পুনরুজ্জীবিত হয় এবং কাওসার হোসেনকে সভাপতি ও আজিম হোসেন সুহাত-কে সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কমিটি গঠিত হয়।
পরবর্তীতে ২০২৬-২৭ সেশনের জন্য বিএমসিজেএ-এর নতুন কমিটি গঠিত হয়েছে। নবগঠিত এই কমিটিতে মোহাম্মদ তানজিল সভাপতি এবং মেহরাফ হোসেন রিফাত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
সংগঠনের প্রতিষ্ঠাকালীন ও সাবেক জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ—আযাদ আলাউদ্দীন, মাসুম মিজান, তাওহীদ সৌরভ, মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম হৃদয়, কাওসার হোসেন ও আজিম হোসেন সুহাত বর্তমানে এই সংগঠনের ‘উপদেষ্টা পরিষদ’-এর সম্মানিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং নবীণদের দিকনির্দেশনা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
শেষকথা
একটি সাধারণ চিন্তা, কিছু তরুণ উদীয়মান সাংবাদিকের স্বপ্ন ও কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া ‘বিএম কলেজ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন’ আজ ক্যাম্পাসে সত্য প্রকাশ ও মুক্তচিন্তার এক অনন্য প্রতীক। নবগঠিত কমিটির জন্য রইল অশেষ শুভকামনা। তরুণ শিক্ষার্থীরা পেশাদারিত্বের চর্চা বজায় রেখে ক্যাম্পাসের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবে এবং সত্যের আলো ছড়িয়ে যাবে—প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে এটিই আমাদের প্রাণের প্রত্যাশা।




