উপসাগরীয় দেশগুলোকে কড়া হুঁশিয়ারি ইরানের

বরিশাল জার্নাল ডেস্ক

নিজেদের মাটি, আকাশসীমা কিংবা সামরিক ঘাঁটি আমেরিকাকে ব্যবহার করতে দিলে নিরপেক্ষ থাকার দাবি আর মানবে না ইরান। বরং সেটিকে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়া হিসেবেই দেখা হবে, উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের এমনই কড়া বার্তা দিল তেহরান। সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের সঙ্গে সমস্ত বাণিজ্যিক ও আর্থিক লেনদেন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই হুঁশিয়ারি এল। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং ভেস্তে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার মধ্যে নতুন এই উত্তেজনায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বুধবার ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল আলি আবদোল্লাহি উপসাগরীয় দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীকে কোনও ধরনের সহায়তা বা সুযোগ দেওয়া হলে সেটিকে আমেরিকার সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণ হিসেবে গণ্য করবে তেহরান। তার বক্তব্য, যুদ্ধের শুরু থেকে মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশ ঘোষণা করেছে, ইরানে হামলার জন্য তারা নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেবে না। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি কতটা মানা হচ্ছে, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

আবদোল্লাহির সন্দেহের কেন্দ্রে উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলো। তার বক্তব্য, এত বিপুলসংখ্যক সামরিক বিমান, বিশেষ করে আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, আঞ্চলিক ঘাঁটিতে অবস্থান করছে অথচ আয়োজক দেশগুলো কিছুই জানে না, এমনটা বিশ্বাস করা কঠিন। প্রতিবেশী দেশগুলোকে উদ্দেশ করে তার বার্তা, তেহরান পরিস্থিতির সমস্ত দিক সম্পর্কে অবহিত।

এই সতর্কবার্তার ঠিক আগের দিন মঙ্গলবার ইরানের সঙ্গে সমস্ত বাণিজ্য, ব্যবসায়িক বিনিময় ও আর্থিক লেনদেন ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত’ স্থগিত করার ঘোষণা দেয় সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক আফরা আল হামেলি বলেছেন, আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটেই এই সিদ্ধান্ত। এত দিন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক দরজা ছিল আমিরাত, বিশেষ করে দুবাই। ফলে আবুধাবির সিদ্ধান্ত তেহরানের জন্য শুধু কূটনৈতিক ধাক্কা নয়, অর্থনীতির উপরও নতুন চাপ।

আমিরাতের অভিযোগ, ইরান থেকে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তাদের দিকে এসেছিল। পরে আবুধাবি জানায়, ক্ষেপণাস্ত্র দুটির লক্ষ্য ছিল উপসাগরে চলাচলকারী জাহাজ। সেগুলো সমুদ্রে পড়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তেহরান অবশ্য এই হামলার দায় অস্বীকার করেছে। ইরানের দাবি, সাম্প্রতিক ওই অভিযানের সঙ্গে তাদের সশস্ত্র বাহিনীর কোনও সম্পর্ক নেই।

এই অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের পটভূমিতে রয়েছে হরমুজ প্রণালিতে কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাত। আমিরাতের রাষ্ট্রীয় তেল সংস্থা অ্যাডনকের সঙ্গে যুক্ত একাধিক জাহাজ এর আগে হামলার মুখে পড়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আমিরাতের মালিকানাধীন বা সংশ্লিষ্ট প্রায় ২০টি ট্যাঙ্কারে হামলার অভিযোগ উঠেছে। হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলও যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় ব্যাপকভাবে কমে গেছে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ হওয়ায় এখানকার প্রতিটি নতুন উত্তেজনার প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারেও।

ইরান ও আমিরাতের সম্পর্ক অবশ্য বরাবর এমন ছিল না। উপসাগরের দুই পারে থাকা দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক, পারিবারিক ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ রয়েছে। আমিরাতে বড় একটি ইরানি জনগোষ্ঠীও বসবাস করে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও দুবাই ছিল ইরানি ব্যবসা ও পুনঃরপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এমনকি জুনেও দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাতে আবুধাবি তেহরান থেকে নিজের রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করেছে; ইরান-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি স্কুল ও একটি হাসপাতালও বন্ধ করেছে।

আমিরাত একই সঙ্গে এমন খবরও অস্বীকার করেছে যে তারা নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা ইরানকে আর্থিক সুবিধা দিচ্ছে। দেশটির প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বুধবার এ ধরনের খবরকে ‘মিথ্যা’ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারের অংশ বলে দাবি করেন। এর আগে জুনেও আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছিল, ইরানের কোনও জব্দ করা অর্থ ছাড় বা স্থানান্তর করেনি তারা।

এই উত্তেজনার মধ্যেই আরও জটিল হয়ে উঠেছে ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্ক। হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতার কাঠামো তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগ ভেস্তে যায়। দু’পক্ষ সাম্প্রতিক সময়ে বার্তা আদান-প্রদানের কথা বললেও মঙ্গলবার ট্রাম্প জানিয়ে দেন, ইরানের সঙ্গে কোনও আলোচনা চলছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হরমুজের একটি মানচিত্র প্রকাশ করে সেটিকে ‘নতুন মার্কিন ভূখণ্ড’ বলেও কটাক্ষ করেন তিনি।

এর পরেই ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে ওয়াশিংটন। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বৃহস্পতিবার বলেছেন, তেহরানের উপর ‘ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা’ আরোপের প্রস্তুতি চলছে। ট্রাম্পও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইরানকে অর্থনৈতিক ‘লাইফলাইন’ দেওয়া দেশ বা প্রতিষ্ঠান গুরুতর আর্থিক পরিণতির মুখে পড়তে পারে। অর্থাৎ এক দিকে ওয়াশিংটন চাইছে তেহরানকে অর্থনৈতিক ভাবে বিচ্ছিন্ন করতে, অন্য দিকে ইরান উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের সতর্ক করছে, আমেরিকার সেই অভিযানে সাহায্য করলে তাদের আর নিরপেক্ষ বলে বিবেচনা করা হবে না।

এখানেই বাড়ছে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ভয়। সৌদি আরব, আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইন শুরু থেকেই বলে এসেছে, ইরানে মার্কিন হামলার ঘাঁটি হিসেবে নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দিতে চায় না তারা। তবে সংবাদমাধ্যমে এসব দেশের সামরিক সম্পৃক্ততা নিয়ে বিভিন্ন দাবি এসেছে, যার অনেকগুলিই তারা অস্বীকার করেছে। ইরান এখন সেই ঘোষণাগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রকাশ্যে প্রশ্নের মুখে তুলল।

ফলে হরমুজের সংকট আর শুধু ইরান ও আমেরিকার দ্বন্দ্বে আটকে নেই। এক দিকে আমিরাত তেহরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের দরজা বন্ধ করছে, অন্য দিকে ইরান প্রতিবেশীদের সামনে নতুন ‘লাল রেখা’ টেনে দিচ্ছে, আমেরিকাকে সাহায্য করলে সেটি হবে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার শামিল। সেই রেখা যদি সত্যিই অতিক্রম হয়, হরমুজকে ঘিরে ছয় মাসের সংঘাত গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলে আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কাই এখন সবচেয়ে বড়।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top