‘দেশের জন্য জান দেব, এক ইঞ্চি মাটিও ছাড়ব না’

বরিশাল জার্নাল ডেস্ক

হাতে হাতে বাঁশের লাঠি, চোখে নির্ভীক দৃষ্টি। কারও বয়স মাত্র ১০, আবার কারও শরীর বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে। কিন্তু মাতৃভূমির সীমানা সুরক্ষার প্রশ্নে তারা সবাই এক অনড় প্রাচীর। জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জ সীমান্তে এখন এমনই এক আবেগঘন দৃশ্য দেখা গেছে। প্রিয় জন্মভূমিকে ভারতের পুশইন ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড থেকে রক্ষা করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) পাশে আনসার সদস্যসহ গ্রামের সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দিন-রাত সীমান্ত পাহারা দিচ্ছেন।

​শুক্রবার (১২ জুন) সকাল থেকে সীমান্ত এলাকায় বিজিবির কঠোর পাহারা ও নজরদারি দেখা গেছে। বর্তমানে সীমান্তে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা বা উত্তেজনা না থাকায় অনাকাঙ্ক্ষিত ভিড় এড়াতে স্থানীয় উৎসুক জনতা সীমান্ত এলাকা ছেড়ে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গেছে।

এর আগে, বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলার সীমান্তের কাঁটাতারের এপাশে কোনো উসকানি বা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে স্থানীয় শিশু থেকে শুরু করে ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ সবাই এখন পাহারাদারের ভূমিকায়। বিজিবির টহলের পাশাপাশি সাধারণ গ্রামবাসীরাও দলবদ্ধ হয়ে লাঠি হাতে সীমান্তরেখা বরাবর অবস্থান নিয়েছেন। কখনও রোদে পুড়ে আবার কখনও বৃষ্টি, কোনোকিছুই যেন তাদের থামিয়ে রাখতে পারছে না। দিনশেষে রাতের অন্ধকার উপেক্ষা করেও তারা দাঁড়িয়ে থাকেন দেশের অতন্দ্রপ্রহরী হয়ে।

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত

গত সোমবার (৮ জুন) রাতে প্রথম জামালপুর-কুড়িগ্রাম সীমান্তের আটটি পৃথক পয়েন্ট দিয়ে এক রাতে শতাধিক মানুষকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। অনুপ্রবেশের সুবিধার্থে বিএসএফ সীমান্তের বিপরীত পাশের কয়েকটি এলাকায় ফ্লাডলাইট বন্ধ করে দেয়। ভারতের অভ্যন্তর থেকে ট্রাকযোগে এবং বিভিন্ন উপায়ে লোকজনকে সীমান্তে নিয়ে আসা হয়। তবে বিজিবির কঠোর অবস্থান, সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্কাবস্থানের কারণে বিএসএফের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। তীব্র বাধার মুখে শেষ পর্যন্ত বিএসএফ পিছু হটে।

এরপর মঙ্গলবার (৯ জুন) ভোরে বকশীগঞ্জের কামালপুর সীমান্তের আন্তর্জাতিক ১০৮২ নম্বর পিলারের পাশে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে আবারও সাতজনকে পুশইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। বিষয়টি টের পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে বিজিবি কামালপুর ক্যাম্পের সদস্য ও স্থানীয় গ্রামবাসীরা। তীব্র বাধার মুখে পুশইনের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছয়জন ভারতের অভ্যন্তরে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও এক বৃদ্ধ শূন্যরেখায় (নো ম্যানস ল্যান্ড) আটকে পড়েন।

বুধবার (১০ জুন) আটকে পড়া ব্যক্তিকে নিয়ে দুদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো পক্ষই তাকে নিজেদের নাগরিক হিসেবে গ্রহণে রাজি হয়নি। পতাকা বৈঠকের পর থেকেই সীমান্তে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। একপর্যায়ে সকালের দিকে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে তীব্র বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ওইদিন বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে দেওয়ানগঞ্জ সীমান্ত এলাকায় ভারতের কয়েকজন নাগরিক বাংলাদেশিদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়লে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। তবে বাংলাদেশিদের মারমুখী প্রতিরোধের মুখে টিকতে না পেরে একপর্যায়ে ভারতীয়রা পিছু হটে।

এদিকে শূন্যরেখায় আটকে পড়া সেই বৃদ্ধের জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য অনুযায়ী জানা গেছে, তার নাম ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মন (৬৭)। তিনি রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার চাঁন্দলাই গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবার নাম বাবু চন্দ্র বর্মন এবং মাতা কমলা রানী। ১৯৫৮ সালের ১০ জুলাই জন্ম নেওয়া এই বৃদ্ধ কীভাবে সেখানে গেলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই ঘটনার পর থেকেই পুরো সীমান্তজুড়ে কঠোর সতর্কাবস্থানে ছিলেন জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ, দেওয়ানগঞ্জ ও কুড়িগ্রামের রৌমারী-রাজিবপুর সীমান্তের আশপাশের সাধারণ বাসিন্দারাও।

লাঠি হাতে রুখে দাঁড়াল জনতা

সীমান্ত পরিস্থিতির উন্নয়ন ও ঘরে ফেরা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা রহমত উল্লাহ বলেন, বিজিবির নির্দেশনার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এবং পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক হওয়ায় আমরা সবাই সীমান্ত এলাকা থেকে সরে এসেছি। আমরা ঘরে ফিরেছি ঠিকই, তবে আমরা সবসময় সতর্ক আছি। আমাদের গ্রাম ও দেশ সুরক্ষায় প্রয়োজনে যে কোনো সময় আবারও বিজিবির পাশে এসে দাঁড়াব।

লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ষাটোর্ধ্ব রনি বুক ফুলিয়ে বলেন, এই মাটি আমার মায়ের মতো। বিএসএফ অন্যায়ভাবে মানুষ পুশইন করবে আর আমাদের ওপর ঢিল ছুড়বে, তা মেনে নেওয়া যায় না। বিজিবি ভাইদের একা কেন ছাড়ব? আমরাও আছি তাদের সঙ্গে। দেশের জন্য জান দিতে পারি, কিন্তু এক ইঞ্চি মাটিও ছাড়ব না।

স্থানীয় বাসিন্দা জীবন মিয়া বলেন, ‘আমাদের সীমান্তের এপাশে কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই। বিএসএফ অনেক সময় আলো বন্ধ করে দেয়। অন্ধকারের সুযোগে মানুষকে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।’

সীমান্তরেখায় বাবার সঙ্গে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা দশম শ্রেণির ছাত্র সিয়াম হোসেন বলেন, ‘বিকেলে যখন ওপার থেকে ভারতীয়রা আমাদের দিকে ইট ছুড়ছিল, তখন আমরা সবাই মিলে প্রতিরোধ গড়ে তুলি। আমাদের ধাওয়ায় ওরা পালিয়ে গেছে। বিজিবি ভাইদের সহযোগিতা করতে সকাল থেকে আমি এখানে আছি। দেশের সুরক্ষায় আমরা তরুণেরা দরকার হলে রাত জেগে পালাক্রমে সীমান্ত পাহারা দেব।’

বকশীগঞ্জের বাসিন্দা মতিন বলেন, বিএসএফ প্রায়ই এই সীমান্ত দিয়ে পুশইনের উসকানি তৈরি করে। বুধবারের ঘটনার পর থেকে আমাদের মনে হয়েছে, শুধু বিজিবির ওপর ভরসা করে বসে থাকলে চলবে না। তাই গ্রামের ছোট-বড়, বৃদ্ধ-যুবক সবাই লাঠিসোঁটা নিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছে। আমরা যতক্ষণ আছি, সীমান্ত দিয়ে কোনো অবৈধ অনুপ্রবেশ ঘটতে দেব না।

সীমান্তের বাস্তবতা তুলে ধরে পাররামরামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সেলিম মিয়া এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমাদের নিজস্ব কাঁটাতারের বেড়া নেই, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থাও নেই। বিএসএফ যখন তাদের পাশের আলো বন্ধ করে দেয়, তখন পুরো এলাকা অন্ধকার হয়ে যায়। এই সুযোগে পুশইনের চেষ্টা করা হয়। আমরা চাই সীমান্ত সুরক্ষায় আরও বাজেট ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হোক।

‘নিয়ম ভঙ্গ হয় এমন কিছু করা যাবে না’

জামালপুর সীমান্তে উপস্থিত স্থানীয় উৎসুক জনতার উদ্দেশে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৩৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল হাসানুর রহমান বলেন, আপনাদের উপস্থিতি আমাদের সাহস ও শক্তি জুগিয়েছে এবং সকাল থেকে পাশে থাকায় আমরা আপনাদের ধন্যবাদ জানাই। তবে মনে রাখতে হবে, আমাদের সবার কাজের একটা সীমারেখা আছে। আইন অনুযায়ী সীমান্তে শুধুমাত্র বিজিবি আসতে পারে, অন্য কারও আসার সুযোগ নেই।

তিনি আরও বলেন, স্থানীয় বাসিন্দারা যেভাবে আমাদের সহযোগিতা করেছেন, সেজন্য আমরা কৃতজ্ঞ। কিন্তু এমন কিছু করা যাবে না যাতে নিয়ম ভঙ্গ হয়। পরিস্থিতির সমাধানের প্রক্রিয়া ও নিয়ম আমাদের জানা আছে। আপনারা বিজিবির প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রাখুন। বর্তমান পরিস্থিতির সমাধান হয়ে গেছে। তাই কোনো প্রয়োজন ছাড়া সীমান্ত এলাকায় ভিড় না করে, সবাইকে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।

এশিয়া পোস্ট

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top