প্রতিরক্ষা খাতে তুরস্কের দিকে ঝুঁকেছে বাংলাদেশ

বরিশাল জার্নাল ডেস্ক

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বাংলাদেশ সফর করছেন। ঢাকা সফরকালে শুক্রবার (৫ জুন) দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বৈঠক করেন।

বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তারা জানান, বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি সামরিক খাতে সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। 

এক দশক আগেও বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের প্রধান উৎস ছিল চীন, রাশিয়া ও পশ্চিমা কিছু দেশ।

কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই সমীকরণে দ্রুত উত্থান ঘটেছে তুরস্কের। ড্রোন, রকেট সিস্টেম, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম থেকে শুরু করে যৌথ উৎপাদন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের আলোচনা—সব মিলিয়ে ঢাকা ও আঙ্কারার প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এখন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে।
 

কেন তুরস্কের দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ?

বাংলাদেশের ‘ফোর্সেস গোল-২০৩০’ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলা। অন্যদিকে তুরস্ক গত দুই দশকে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, বর্তমানে তারা ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার ও সাঁজোয়া যান রপ্তানিতে বিশ্বের অন্যতম উদীয়মান শক্তি।

 

কূটনৈতিক সূত্র বলছে, বাংলাদেশ এমন সরঞ্জাম খুঁজছে, যা পশ্চিমা প্রযুক্তির কাছাকাছি সক্ষমতা দেয়, কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল এবং রাজনৈতিক শর্তও কম থাকে। তুরস্ক সেই শূন্যস্থান পূরণ করছে।

কী কী সামরিক সরঞ্জাম কিনেছে বাংলাদেশ?

তুরস্ক থেকে বাইরাকতার টিবি-২ ড্রোন কিনেছে বাংলাদেশ। ২০২২ সালে বাইরাকতার টিবি-২ ড্রোন কিনতে তুরস্কের প্রতিষ্ঠান বাইকার টেকনোলজির সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী। বাইরাকতার টিবি-২ ড্রোন ক্রয়কে বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতার একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইউক্রেন, লিবিয়া ও নাগোরনো-কারাবাখ যুদ্ধে এই ড্রোনের কার্যকারিতা বিশ্বব্যাপী আলোচিত হয়েছিল।

তুরস্ক থেকে মাইন-সুরক্ষিত যান এবং বহুমাত্রিক রকেট প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও কিনেছে বাংলাদেশ। এছাড়া গত কয়েক বছরে তুরস্ক থেকে গ্রাউন্ড সার্ভেইলেন্স রাডার, সাঁজোয়া যান, বহনযোগ্য জ্যামার, মিসাইল লঞ্চিং সিস্টেম, ওরলিকন স্কাইগার্ড রাডার সিস্টেমসহ নানা ধরনের সমরাস্ত্র কেনা হয়েছে।

যৌথ উৎপাদনের পথে ঢাকা-আঙ্কারা

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প কর্তৃপক্ষের প্রধান অধ্যাপক হালুক গোরগুন ঢাকা সফর করেন। সে সময় উভয় পক্ষ যৌথ প্রতিরক্ষা শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করে। বাংলাদেশে অস্ত্র, গোলাবারুদ, সামরিক যান এবং ড্রোন উৎপাদনের জন্য যৌথ উদ্যোগ গড়ে তোলার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। তুরস্কের প্রযুক্তি ও বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতার সমন্বয় ঘটানোর লক্ষ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর

বাংলাদেশের সামরিক কর্মকর্তাদের জন্য তুরস্ক প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে আগ্রহ দেখিয়েছে। ড্রোন পরিচালনা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্র ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সহযোগিতার আলোচনা চলছে।

কেবল অস্ত্র কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে প্রযুক্তি অর্জনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে চায় বাংলাদেশ।

নেপথ্যের কূটনীতি

বাংলাদেশ ও তুরস্কের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, উভয় দেশই মুসলিম বিশ্বের মধ্যপন্থী ও বাস্তববাদী রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে চায়।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশ প্রায়ই কাছাকাছি অবস্থান নিয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটে তুরস্ক শুরু থেকেই বাংলাদেশের পাশে ছিল। অন্যদিকে জাতিসংঘ, ওআইসি এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ঢাকা ও আঙ্কারা নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছে। সদ্য সমাপ্ত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের নির্বাচনে বাংলাদেশকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছে তুরস্ক।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার পেছনে গত কয়েক বছরে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নিয়মিত মন্ত্রী পর্যায়ের সফর, সামরিক প্রতিনিধিদলের আদান-প্রদান এবং প্রতিরক্ষা শিল্প প্রতিনিধিদের বৈঠক এই সম্পর্ককে নতুন ভিত্তি দিয়েছে।

কৌশলগত অংশীদারত্ব

বাংলাদেশ-তুরস্ক প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এখন আর বিচ্ছিন্ন কিছু অস্ত্র কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ড্রোন, রকেট, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যৌথ উৎপাদন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর—সব মিলিয়ে এটি ধীরে ধীরে একটি কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ নিচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরে তুরস্ক বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সহযোগী হয়ে উঠতে পারে।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে যা বলছেন দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী

ঢাকা সফরকালে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান সামরিক সহযোগিতা প্রসঙ্গে বলেন, বাংলাদেশে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা জোরদারে আগ্রহী তুরস্ক। দুই দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। বৈঠকে এ বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়েছে।

অন্যদিকে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান বলেন, তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা নিয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে সামরিক বিশেষজ্ঞ মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, তুরস্ক বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়াতে চায়। এদিকে বাংলাদেশও চায়, কেননা তুরস্ক এখন অনেক আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম তৈরি করেছে। এসব সরঞ্জাম বাংলাদেশে রপ্তানিতে আগ্রহী তুরস্ক। তবে এখানে তুরস্কের আর্থিক বিষয়টিই শুধু মুখ্য নয়। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব দিতে চান। সে কারণে মুসলিম দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে তিনি আগ্রহী। আর বাংলাদেশ একটি মুসলিম দেশ। এছাড়া এখানে তুরস্কের ভৌগোলিক ও কূটনৈতিক স্বার্থও আছে। অন্যদিকে তুরস্কের আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম তুলনামূলক সাশ্রয়ী। সে কারণেই সামরিক কেনাকাটায় উভয় দেশই পারস্পরিকভাবে লাভবান হতে পারে।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাতে তিন দিনের সফরে ঢাকায় এসেছেন। আগামীকাল (শনিবার) সফর শেষে তিনি ঢাকা ছাড়বেন।

বাংলা নিউজ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top