বরিশাল জার্নাল ডেস্ক
নবজাতক শিশুর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্বজন ও শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) শিক্ষার্থীদের মধ্যে তুলকালাম ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় মৃত শিশুর মামাসহ দুজনকে বেধম মারধর করে আটকে রাখেন মেডিকেল কলেজ শিক্ষার্থীরা। পরে হাসপাতাল পরিচালক, মেডিকেল কলেজ প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের হস্তক্ষেপে গভীর রাতে ক্ষমা চেয়ে মুচলেকা দিয়ে রক্ষা পেয়েছেন তারা।
মঙ্গলবার (২০ মে) রাত ১০টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ডে এই ঘটনা ঘটে। এ সময় নবজাতকের লাশ আটকে রাখার অভিযোগও ওঠে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে। তবে এ নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে।
নবজাতক ওয়ার্ড সূত্রে জানা গেছে, বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার চাখারের বাসিন্দা উজ্জল দের ৭ দিনের কন্যাসন্তান অসুস্থ হওয়ায় তাকে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শিশুটির মৃত্যু হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শিশুটির মৃত্যুর পরপরই স্বজনরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং চিকিৎসকের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ তোলেন, যা নিয়ে সাদা ইউনিফর্ম পরিহিত ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে স্বজনদের বাগ্বিতণ্ডা হয়। এর কিছুক্ষণ পরে মেডিকেল কলেজের কিছু শিক্ষার্থী এসে মৃত শিশুর মামা জয়দেবকে মারধর করেন। সেই ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে মামুন নামে আরেক রোগীর স্বজনও মারধরের শিকার হন। পরে তাদের টেনেহিঁচড়ে হাসপাতালের নিচতলার জরুরি বিভাগের একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়।
যদিও মারধরের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থী শান্ত তালুকদার বলেন, ‘মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের সকালে ও বিকেলে ওয়ার্ড থাকে এবং এর ওপর আইটেম থাকে। আইটেম দিয়ে বের হওয়ার সময় মৃত শিশুর বাবা তার স্বজনদের আমাদের আটকে রাখতে বলেন। তার অভিযোগ ভুল চিকিৎসার জন্য শিশুটির মৃত্যু হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘মৃতের স্বজনরা আমাদের আটকানোর চেষ্টাকালে মেয়ে শিক্ষার্থীদের অ্যাপ্রোন ও ব্যাগ ধরে টান দেয়। সেসঙ্গে ওয়ার্ডের দায়িত্বরত নার্সদেরও হেনস্তা করে।’
অপর শিক্ষার্থী মুনয়াত মুন বলেন, ‘নবজাতক ওয়ার্ডের পাশে আমাদের একটি ক্লাসরুম ছিল, সেখান থেকে বের হওয়ার সময় হট্টগোলের বিষয়টি শুনতে পাচ্ছিলাম। তবে সেখান থেকে যাওয়ার সময় একটা লোক আমাদের কারও হাত এবং কারও ওড়না, আবার কারও ব্যাগ ধরে টান দেন এবং অশোভন আচরণ শুরু করেন। এরপর আমরা আত্মরক্ষার্থে সেবিকাদের সহায়তায় একটা রুমে আশ্রয় নেই। এরপর দুই ছেলে ব্যাচমেট এসে তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু সে তাদেরও মোবাইল ভাঙচুর করে, পরে ইউনিফর্ম লুকিয়ে আমরা সেখান থেকে পালিয়ে আসি।’
শিশুর বাবা উজ্জল জানান, সন্ধ্যার পর তার সন্তানের শ্বাসকষ্ট হওয়ায় চিকিৎসকের কাছে যান তারা। ওইসময় রুমে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা ছিলেন। তারা এসে শিশুকে মৃত ঘোষণা করলে, তার মামা আবেগআপ্লুত হয়ে পড়েন। এ সময় তিনি ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ওয়ার্ড থেকে যেতে নিষেধ করলে তাকে এবং অপর আরেক ব্যক্তিকে মারধর করে।
মৃত শিশুর মা পূজা রানী দাস বলেন, ‘সন্তানের মৃত্যুর পর তার মামা হয়তো মুখে কিছু বলেছে। কিন্তু কারও গায়ে হাত দেয়নি। তারপরও তাকে শিক্ষার্থীরা মারতে মারতে নিচে নিয়ে গেছে। যদি আমার ভাই কোনো ভুল করে থাকে, তাহলে আমি হাতজোড় করে ক্ষমা চাইছি। আমাদের মাফ করে দেন। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত এখানে মৃত সন্তানকে নিয়ে বসে আছি। আমাদের যেতে দিন।’
এদিকে, শিক্ষার্থীরা শিশুটির মামাসহ দুজনকে আটকে রাখার খবরে হাসপাতাল পরিচালক ও কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে আসেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা আটক দুজনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। সেসঙ্গে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে, সে লক্ষ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইনের বাস্তবায়ন চান শিক্ষার্থীরা। সবশেষ রাত দেড়টায় ছেড়ে দেওয়া হয় শিশুর মামা জয়দেবকে।
এ বিষয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার অলক কান্তি শর্মা বলেন, ‘ছাত্র আর রোগীর স্বজনদের মধ্যে কথা কাটাকাটির সূত্র ধরে অপ্রত্যাশিত একটি ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি নিয়ে সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ যাদের কাছ থেকে পাব, তার সূত্র ধরেই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. একেএম মশিউল মুনীর বলেন, ‘বিষয়টি উভয়পক্ষের সঙ্গে বসে সমাধান করা হয়েছে। আমরা চাই, এখানে যারা পড়ালেখা করছে, তারা যেন স্বাভাবিকভাবে ইউনিফর্ম পরে ক্যাম্পাসে চলাফেরা করতে পারে। সেসঙ্গে রোগীদেরও যেন ঠিকভাবে চিকিৎসা হয়। সমস্যা আমাদের অনেক রয়েছে, ধীরে ধীরে সমাধান করতে হবে এবং ধৈর্য ধরতে হবে।’
কালবেলা




