‘ভিডিও ভাইরাল হইছে কিন্তু আমার কষ্ট তো কমেনি’

বরিশাল জার্নাল ডেস্ক

হাতে লম্বা বুম, টেলিভিশন সাংবাদিকদের মতো ভঙ্গি আর সহজ-সরল আঞ্চলিক ভাষায় লাইভে দাঁড়িয়েছেন জিলাপির দোকানের সামনে। দোকানিকে প্রশ্ন রাখেন, ‘আজকে মহান ২৬ মার্চ উপলক্ষে জিলাপি কত করে বেছতেছেন? সরকারি রেটে যদি জনগণকে একটু বলতেন, তাইলে অনেক খুশি হইতাম।’ এমন একটি ভিডিও প্রকাশ করেন নিজের ফেসবুক পেজে। তাতেই ভাইরাল হয়ে যান কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের সরকারপাড়া চর গ্রামের বাসিন্দা তাইজুল ইসলাম তাজু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি এখন ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে পরিচিত।

 

অভাব-অনটনের কারণে কখনো স্কুলের বারান্দায় পা রাখেননি তাইজুল ইসলাম। কিন্তু নিজের এলাকার বিভিন্ন সমস্যার চিত্র তুলে ধরে ভিডিও কন্টেন্ট তৈরি করেন তাইজুল। পরে এসব কন্টেন্ট নিজের ফেসবুক পেজে প্রচার করেন। তার সারল্য উপস্থাপনার কারণে দেশজুড়ে রাতারাতি ব্যাপক পরিচিত পান তিনি।

 

তাইজুল ইসলামের ‘তাজু ভাই ২.০’ পেজ ঘুরে দেখা গেছে, তিনি নানা বিষয়ে কন্টেন্ট তৈরি করে তা পেজে প্রকাশ করেন। তার ফলোয়ারের সংখ্যা বাড়ছে হু হু করে। এরই মধ্যে তার ফলোয়ারের সংখ্যা লক্ষাধিক হয়ে গেছে। ভাইরাল হওয়ার আগে যা ছিল প্রায় ছয় হাজারের মতো।

 

তবে যে উদ্দেশে ভিডিও বানান তাইজুল, ভাইরাল হলেও সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেননি তিনি। এদিকে সংসারের অভাব-অনটন এখনো পিছু ছাড়েনি তার। তিনি ভেবেছেন তার ফেসবুক পেজটি মনিটাইজেশন হবে, এতে আয় হবে। কিন্তু তা এখনো না হওয়ায় মন খারাপ তার। এ জন্য আগের পেশায় ফিরে যাওয়ার কথাও ভাবছেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চারদিকে নদীবেষ্টিত দুর্গম চরাঞ্চল নাগেশ্বরী উপজেলা। এই উপজেলার সরকারপাড়া চর গ্রামের বাসিন্দা সিরাজ ও তাহেরা দম্পতির তিন ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে বড় সন্তান তাইজুল ইসলাম তাজু।

 

তাইজুলের দাম্পত্য জীবন অভাবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অসুস্থ বাবা-মা ও দুই ভাই-বোনের লেখাপড়ার খরচও তাকে জোগাতে হয়। রাজমিস্ত্রীর সহকারী হিসেবে কাজ করে যে আয় হয়, তা দিয়ে কুলাতে পারছেন না। তাই মাত্র আট হাজার টাকার একটি মোবাইল ফোন দিয়েই শুরু করেন ভিডিও তৈরি। মাঝেমধ্যে নিজের জীবনসংগ্রামের কথাও তুলে ধরে কন্টেন্ট বানান তিনি।

 

ছবি : এশিয়া পোস্ট

স্থানীয়রা জানান, গ্রামের নানা সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে একের পর এক ভিডিও তৈরি করতে থাকেন তাইজুল। তিনি বিষয়বন্তু নির্বাচন আর সরল উপস্থাপনা ও আবেগঘন কথামালা মানুষের মন ছুঁয়ে যায়। স্থানীয়রাও এতেই খুশি। কিন্তু কেউ কেউ তার এসব কর্মকাণ্ডে সমালোচনাও করেন। এতে তিনি মোটেই কর্ণপাত করেন না।

 

স্থানীয় সাদ্দাম হোসেন নামের একজন বলেন, তাজু আমাদের এলাকার গর্ব। ওর সরলতা আর প্রতিভাকে সম্মান করা উচিত। কেউ যেন তাকে নিয়ে ট্রোল না করে, বরং সবাই তার পাশে দাঁড়ালে সে উপকৃত হবে। খুব সহজ ভাষায় আমাদের এলাকার কথা বলে। তাই মানুষ পছন্দ করে, ভাইরালও হয়েছে।

 

নিজের প্রতিভা ও উদ্যোগ নিয়ে তাইজুল ইসলাম তাজু বলেন, ‘মানুষ ভালোবাসা দিছে, ভিডিও ভাইরাল হইছে। কিন্তু আমার তো এখনো কষ্টই কমে নাই। পেইজে মনিটাইজেশন নাই, আয় নাই, সংসার চালানো কষ্ট হয়। চিন্তা করছি, আবারও ঢাকা গিয়ে কাজ করব, কাজ না করলে তো আর ভাত জুটবে না পরিবারে।’

 

তিনি আরও বলেন, ‘আমার বাবা-মা শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবারের দুঃখ-কষ্ট দূর করতে আমি ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না। সাংবাদিকরা আমাদের এলাকার খবর করেন না। তাই আমি নিজেই ভিডিও করি। আমি বোকাসোকা মানুষ, ভুল হতেই পারে। আমাকে ট্রল করলেও আমার কষ্ট নেই। আমি চাই চরের মানুষের উন্নতি হোক।’

 

নারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৭ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য কবিরুল ইসলাম বলেন, নদীভাঙনের কবলে পড়ে ভিটেমাটি হারিয়ে বর্তমানে অন্যের জায়গায় বসবাস করছে তাজুর পরিবার। এমন পরিস্থিতিতে তার এই অর্জনকে সম্মান জানিয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন এই জনপ্রতিনিধি। এশিয়া পোস্ট

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top