সুদের ভয়াবহতা

মুহাম্মদ আবু সালেহ 

‘সুদ’ শব্দটি বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত হয়, যা ঋণের উপর প্রদেয় অতিরিক্ত অর্থ বোঝায়। আরবিতে সুদকে বলা হয় রিবা। শরিয়তের পরিভাষায় সুদ বলতে সেই অতিরিক্ত অর্থকে বোঝায়, যা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঋণ প্রদান করা হয় এবং মূলধনের অতিরিক্ত হিসেবে ফেরত নেয়া হয়।

সুদ মূলত দুই প্রকার :
১. রিবা আন-নাসিয়া : এটি ঋণের উপর নির্ধারিত অতিরিক্ত অর্থ, যা নির্দিষ্ট সময় শেষে মূল ঋণের পাশাপাশি ফেরত নেয়া হয়।
২. রিবা আল-ফাদল : এটি হলো- পণ্য বা সম্পদ বিনিময়ের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মূল্য দাবি করা, যখন একই ধরনের পণ্য বিনিময় করা হয়।

সুদের বিধান :

ইসলামে সুদ হারাম বা নিষিদ্ধ বলে গণ্য করা হয়েছে, কারণ এটি অন্যায়ভাবে একজন ব্যক্তির সম্পদ বাড়ানোর মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়। কুরআনে সুদ (রিবা) হারাম হওয়ার ব্যাপারে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন- ‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা কিছু অবশিষ্ট আছে তা ছেড়ে দাও।’ (সূরা আল-বাকারা-২৭৮)

আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র আরো বলেন- ‘হে মুমিনগণ! দ্বিগুণ-চতুর্গুণ করে সুদ খেও না, আর আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ (সূরা আলে ইমরান-১৩০)

সুদের ভয়াবহতা :

১. সুদের সাথে জড়িত ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের যুদ্ধের ঘোষণা। পবিত্র কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে- ‘কিন্তু যদি তোমরা তা না করো তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা নাও, আর যদি তোমরা তাওবা করো, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই থাকবে। তোমরা জুলুম করবে না এবং তোমাদের জুুলুম করা হবে না।’ (সূরা বাকারা-২৭৯)

২. সুদি লেনদেনের সাথে জড়িত ব্যক্তি মারা গেলে কেয়ামত দিবসে তাকে এমনভাবে উঠানো হবে যেন শয়তান স্পর্শ করে পাগল বানিয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-‘যারা সুদ খায়, তারা তার মতো (কবর থেকে) উঠবে, যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল বানিয়ে দেয়।’ (সূরা বাকারা-২৭৫)

৩. হাশরের মাঠে সুদের সাথে জড়িত ব্যক্তিকে গলা চেপে উঠানো হবে। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: নবীজী সা: থেকে বর্ণনা করেন- ‘সুদ গ্রহণকারীকে কিয়ামত দিবসে এমনভাবে উঠানো হবে যেন সে পাগল এবং গলা চেপে ধরা হয়েছে এবং তাকে বলা হবে, তুমি তোমার যুদ্ধের সরঞ্জামাদি প্রস্তুত করো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য।’ (উমদাতুত তাফসির-১/৩৩০)

৪. সুদের সাথে জড়িত ব্যক্তির কারণে এলাকায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। আগের মতো আর ফসল ফলে না, সময়মতো বৃষ্টি হয় না। নবীজী সা: বলেন, ‘যে এলাকার সুদের প্রচলন প্রকাশ হয়ে যায়, সে এলাকায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।’ (মুসনাদে আহমদ-১৭৮২২)

৫. যে এলাকায় সুদ ও ব্যভিচার ব্যাপক হয়ে যায়, সে এলাকায় আল্লাহ তায়ালার গজব অবতীর্ণ হয়। নবীজী সা: বলেন, ‘কোনো এলাকায় যদি ব্যভিচার ও সুদের লেনদেন ব্যাপক ও অতি সহজ হয়ে যায়, তাহলে তারা নিজেদের উপর আল্লাহর আজাবকে বৈধ করে নিলো।’ (আত তারগিব ওয়াত তারহিব)
৬. সুদের সাথে জড়িত ব্যক্তির জন্য বরাদ্দকৃত হালাল রিজিকও হারাম হয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-‘সুতরাং ইহুদিদের জুুলুমের কারণে আমি তাদের উপর উত্তম খাবারগুলো হারাম করেছিলাম, যা তাদের জন্য হালাল করা হয়েছিল এবং আল্লাহর রাস্তা থেকে অনেককে তাদের বাধা প্রদানের কারণে। (সূরা নিসা-১৬০)

৭. সুদ খাওয়া মানে আপন মায়ের সাথে ব্যভিচার করা। আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘সুদের গুনাহর ৭০টি স্তর রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে ক্ষুদ্র স্তর হলো আপন মাকে বিয়ে (যেনা) করা।’ (ইবনে মাজাহ-২২৭৪)

লেখক : সহকারী মুফতি, জিননুরাই মাদরাসা, উত্তরা, ঢাকা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top