বরিশাল জার্নাল ডেস্ক
বরিশাল সদর উপজেলা বিএনপির সদ্য ঘোষিত পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে মৃত ব্যক্তিকে রাখা হয়েছে বলে উঠেছে অভিযোগ। কমিটিতে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতসংশ্লিষ্টরাও আছেন- চাউর এমন কথাও। কমিটি গঠনের জন্য নেওয়া হয়নি জেলা বিএনপির কোনো পরামর্শ, জানে না দলটির বরিশাল বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্তরাও।
গত বছরের ১৪ অক্টোবর নুরুল আমিনকে আহ্বায়ক, সাইফুল ইসলাম আব্বাসকে সদস্যসচিব এবং আব্দুস সালাম রাঢ়ীকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের সদর উপজেলা কমিটি অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় বিএনপি। গত ১২ জুলাই অনুমোদন দেওয়া হয় ১৬১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটির।
এর পর থেকে ব্যাপক ক্ষুব্ধ সদর উপজেলা বিএনপির একটি অংশ। বরিশালে সংবাদ সম্মেলন, বিক্ষোভ ও ঝাড়ু মিছিল করেছেন নেতাকর্মীরা।
কমিটিতে মৃত ব্যক্তির নাম আসার বিষয়টি সামনে এনেছেন বরিশাল জেলা (দক্ষিণ) বিএনপির সদস্য ও সদর উপজেলা বিএনপির সাবেক জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক জিয়াউল ইসলাম সাবু।
‘১৬১ সদস্যবিশিষ্ট যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেটি আমরা খুব ভালোভাবে পর্যালোচনা করেছি। কমিটির ১০৭ নম্বর সদস্য মিজানুর রহমান আয়নাল বেপারী মারা গেছেন চলতি বছরের ১৫ মে। তার বাড়ি সদর উপজেলার চরবাড়িয়া ইউনিয়নে।’
সাবুর দাবি, কমিটির ১৮ নম্বর সদস্য ফরিদ উদ্দিন তালুকদার আট বছর ধরে গুরুতর অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী। কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগ সম্পৃক্ত পাঁচজনকে। তারা হলেন- ২২ নম্বর সদস্য সিরাজুল হক মাস্টার, ৬১ নম্বর সদস্য হুমায়ন কবির বাদল ঢালী, ৮৮ নম্বর সদস্য জাহাঙ্গীর হোসেন, ১০২ নম্বর শাহাবউদ্দিন স্বপন এবং ১৩৪ নম্বর সদস্য ক্যাপ্টেন (অব.) আলাউদ্দিন। এ ছাড়া ৬০ নম্বর সদস্য মিরাজ বেপারী ও ৯৮ নম্বর সদস্য গিয়াস উদ্দিন ফকির নামের দুই প্রবাসী ব্যক্তিকে কমিটিতে রাখা হয়েছে।
আয়নালের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন স্ত্রী মিনারা রহমান। ‘উনি দুই মাস আগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। আমরা বর্তমানে বরিশাল নগরীর ভাটিখানা এলাকায় বসবাস করছি।’
নতুন কমিটির আহ্বায়ক নুরুল আমিন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ তুলেছেন সাবু। ‘বিএনপিতে গুপ্ত হিসেবে পরিচিত নুরুল। তার পদ আছে জামায়াতে ইসলামীর বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে। তার পৃষ্ঠপোষকতায় জামায়াতের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো চলছে। ত্যাগীদের বাদ দিয়ে যাদের কাছ থেকে অর্থ নিতে পেরেছেন তাদের এই কমিটিতে জায়গা দিয়েছেন’- বললেন তিনি।
২০২২ সালে নুরুল আমিনকে আহ্বায়ক করে গঠন হওয়া সদর উপজেলা কমিটি দাবির মুখে বিলুপ্ত করা হয়, জানান জিয়াউল। ‘সেই বিতর্কিত ব্যক্তিকে ফের দলে পদ দেওয়াটা আমাদের মতো তৃণমূল নেতাকর্মীদের জন্য কষ্টের। আমরা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনসহ সব আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলাম। তখন এদের কাউকে দেখা যেত না।’
নুরুল আমিনের জামায়াত সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছেন সদর উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মন্টু খানও।
‘নুরুল আমিন নগরীর নথুল্লাবাদের লুৎফর রহমান ক্যাডেট মাদ্রাসার পরিচালক, সোনা মিয়ারপুল এলাকার আল ইখওয়ান এতিমখানা ও মাদ্রাসার সহ-সভাপতি এবং কাগাশুরা গাজী জব্বার আলী মহিলা ক্যাডেট মাদ্রাসার সভাপতি। তিনি জামায়াতের বরিশাল সদরের রুকন ছিলেন। তিনি যাদের নাম দিয়ে কমিটি পাস করিয়ে এনেছেন, তাদের মধ্যে মৃত ব্যক্তিসহ আওয়ামী লীগের লোকজনও আছে।’

বরিশাল সদর উপজেলা কমিটির নতুন আহ্বায়ক নুরুল আমিন
অভিযোগের বিষয়ে বরিশাল সদর উপজেলার সদ্য ঘোষিত কমিটির আহ্বায়ক নুরুল আমিনের ভাষ্য, ‘কমিটি কেন্দ্রে ৪ মাস আগে জমা দেওয়া ছিল। কিন্তু ওই ব্যক্তি ২ মাস আগে মারা গেছেন। কেন্দ্রকে আমরা বলেছি বিষয়টি সংশোধনের জন্য। তা ছাড়া যদি আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট কেউ কমিটিতে থেকে থাকে, তাহলে কেন্দ্রকে সংশোধনের জন্য অনুরোধ করব।’
জামায়াতসংশ্লিষ্টতার বিষয়ে নুরুলের কথা, ‘আমি বহু বছর আগে জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম। বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামে আমাকে যারা দেখেনি তারা বিএনপিই করেন না। আওয়ামী শাসনামলে আমার বিরুদ্ধে ২৬টি মামলা ছিল, ৪ বার কারাবরণ করেছি। এই কমিটি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী পাস করেছেন চেয়ারপারসনের নির্দেশনায়। যারা কেন্দ্রের নির্দেশনা অমান্য করে সংগঠনকে ক্ষতিগ্রস্ত করার অপচেষ্টা করছে, তাদের বিচার দাবি করছি।’
এই কমিটি নিয়ে সমালোচনাকারীদের ‘মাদকসেবী’ আখ্যা দিয়েছেন নতুন আহ্বায়ক। বললেন, ‘আমাদের অভিভাবক বরিশাল সদর আসনের এমপি মজিবর বলেছেন যে, এই কমিটি অত্যন্ত শক্তিশালী। যারা এই কমিটি নিয়ে বিতর্ক ছড়াচ্ছে তারা বরিশালের চিহ্নিত মাদকসেবী হিসেবে পরিচিত।’
‘উপজেলা কমিটি তো দেবে জেলা কমিটি। তারপরও জেলা কমিটির সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করার কথা কেন্দ্রের’- মন্তব্য বরিশাল জেলা (দক্ষিণ) বিএনপির সদস্যসচিব আবুল কালাম শাহীনের। ‘এই কমিটি দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের সঙ্গে ন্যূনতম আলোচনা করা হয়নি। সাংগঠনিকভাবে আমাদের হেয় করা হয়েছে। বিএনপির বরিশাল বিভাগে দায়িত্বপ্রাপ্তরাও কমিটির বিষয়টি অবগত নয়।’
‘দীর্ঘ ১৭ বছর যারা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ছিল না, তাদের এই কমিটিতে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের আর কোথাও জামায়াত থেকে আসা কোনো ব্যক্তিকে বিএনপির কোনো ইউনিটে সরাসরি পদ দেওয়া হয়েছে কি না- সেটি আমার জানা নেই। আমাদের কাছে আরও তথ্য-প্রমাণ আসছে এই কমিটির বিষয়ে। কেন্দ্রে বিষয়টি জানানো হয়েছে’- যোগ করেন আবুল কালাম শাহীন।
অবিলম্বে নতুন এই কমিটি বাতিল করে ত্যাগীদের মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছেন বরিশাল সদর বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীরা।
আগামীর সময়




