যে পাঁচ কারণে হারল ব্রাজিল

ক্রীড়া ডেস্ক

পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের হেক্সা মিশনের স্বপ্ন এবার থমকে গেল নকআউট পর্বের শুরুতেই। পুরো ম্যাচে বল দখল আর আক্রমণের জোয়ার বইয়ে দিয়েও মাঠ ছাড়তে হয়েছে কান্না নিয়ে। বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গেছে সেলেসাওরা। কার্লো আনচেলত্তির দল মাঠের নিয়ন্ত্রণ রাখলেও কৌশলগত দূর্বলতা, পেনাল্টি মিসের খেসারত এবং শেষ মুহূর্তের রক্ষণভাগ ভেঙে পড়ার কারণেই বিদায় নিতে হয়েছে ব্রাজিলকে। নিচে ব্রাজিলের হারের পাঁচটি কারণ ব্যাখ্যা করা হলোঃ

১. নেইমারকে শুরু থেকেই ব্যবহার না করা
ম্যাচের সবচেয়ে বড় এবং বিতর্কিত আলোচনার জন্ম দিয়েছে দলের প্রাণভোমরা নেইমার জুনিয়রকে শুরুর একাদশে না রাখার সিদ্ধান্ত। অথচ ম্যাচের আগেই খোদ কোচ কার্লো আনচেলত্তি গণমাধ্যমকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ‘নেইমার ৯০ মিনিট খেলার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।’ তা সত্ত্বেও রণকৌশলের গ্যাঁড়াকলে তাকে ডাগআউটে বসিয়ে রেখে ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নামানো হয়। নেইমার যোগ দেওয়ার পর ব্রাজিলের আক্রমণে অবিশ্বাস্য গতি ফেরে এবং নরওয়ের ডিফেন্স কাঁপতে শুরু করে। একেবারে শেষ মুহূর্তে যোগ করা সময়ে তিনি পেনাল্টি থেকে একটি গোল শোধ করলেও ততক্ষণে ব্রাজিলের বিদায় নিশ্চিত হয়ে গেছে। ম্যাচের শুরু থেকেই এই পোস্টার বয়কে খেলানো হলে দলের আক্রমণভাগ আরও বেশি সৃজনশীল হতে পারত বলে মনে করছেন ফুটবল বোদ্ধারা।

২. পেনাল্টি মিসে ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়
প্রথমার্ধেই ম্যাচে লিড নেওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল ল্যাটিন আমেরিকার পরাশক্তিরা। ভিএআরের কল্যাণে পাওয়া পেনাল্টি শটটি নিতে আসেন ব্রুনো গিমারায়েস। কিন্তু নরওয়ের গোলরক্ষক অরইয়ান নিয়ল্যান্ড অতিমানবীয় দক্ষতায় সেই শট রুখে দিলে স্তব্ধ হয়ে যায় ব্রাজিলের গ্যালারি। ম্যাচ শেষে দলের এই ব্যর্থতা নিয়ে কোচ আনচেলত্তি জানান, ‘তথ্য-উপাত্ত ও পরিসংখ্যান নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করেই গিমারায়েসকে পেনাল্টি নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।’ তবে কোচের সেই গাণিতিক হিসাব মাঠের বাস্তবে খাটেনি। ওই সময় ব্রাজিল এগিয়ে যেতে পারলে ম্যাচের মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে চলে আসত, উলটো এই পেনাল্টি মিসের পর নরওয়ে দ্বিগুণ আত্মবিশ্বাসে চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

৩. আধিপত্য ছিল, কিন্তু গোল করার ধার ছিল না
বল পজিশন কিংবা পাসিংয়ের ফুলঝুরি ফুটিয়ে ব্রাজিল ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পায়ে রাখলেও কাজের কাজ গোলটি করতে পারেনি। আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের ফাইনাল থার্ডে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলা, শেষ পাসের নিখুঁত অভাব এবং ফিনিশিংয়ের দুর্বলতায় একের পর এক আক্রমণ ভেস্তে গেছে। বিশেষ করে ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে রিয়াল মাদ্রিদ তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের তৈরি করা বেশ কয়েকটি দুর্দান্ত সুযোগ সতীর্থদের ব্যর্থতায় আলোর মুখ দেখেনি। বদলি নামা তরুণ সেনসেশন এন্দ্রিকও গোলপোস্টের সামনে একটি সহজ সুযোগ হাতছাড়া করেন। বিপরীতে নরওয়ে পুরো ম্যাচে হাতেগোনা কয়েকটি কাউন্টার অ্যাটাক থেকে দুটি মোক্ষম সুযোগ পেয়েই তা জালে জড়িয়ে দেয়, যা দুই দলের কার্যকারিতার বড় পার্থক্য গড়ে দিয়েছে।

৪. শেষ ১০ মিনিটে রক্ষণের ভয়াবহ ভাঙন
খেলার সিংহভাগ সময় ব্রাজিলের রক্ষণভাগ নরওয়ের আক্রমণ রুখে দিতে পারলেও ম্যাচের অন্তিমলগ্নে গিয়ে ডিফেন্স লাইন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। আর ব্রাজিলের ডিফেন্ডারদের এই পজিশনিং ভুলের সুযোগটি নিতে বিন্দুমাত্র ভুল করেননি নরওয়েজিয়ান গোলমেশিন আর্লিং হালান্ড। ম্যাচের শেষ ১০ মিনিটে প্রথমে এক দারুণ হেডে নরওয়েকে এগিয়ে নেন এই স্ট্রাইকার। এরপর ব্রাজিল সমতায় ফিরতে অল-আউট আক্রমণে উঠে গেলে রক্ষণভাগ পুরোপুরি অরক্ষিত হয়ে পড়ে। সেই ফাঁকা জায়গার ফায়দা লুটে এক দুর্দান্ত পাল্টা আক্রমণ থেকে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করে ব্রাজিলের কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দেন হালান্ড।

৫. নরওয়ের কৌশলের জবাব দিতে পারেনি আনচেলত্তির দল
নরওয়ে শুরু থেকেই নিজেদের ডিবক্সের সামনে নিচু ব্লকে দেয়াল তুলে রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলেছে এবং সুযোগ পেলেই বিদ্যুৎগতির কাউন্টার অ্যাটাকে উঠেছে। ব্রাজিল মাঝমাঠে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলেও নরওয়ের সেই ডিফেন্সিভ ব্লক ভাঙার কোনো বিকল্প পরিকল্পনা বা ‘প্ল্যান-বি’ দেখাতে পারেনি। ম্যাচ শেষে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে আনচেলত্তি বলেন, ‘আমার দল পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করেছিল, কিন্তু নরওয়ের শক্তিশালী রক্ষণভাগ এবং তাদের পাল্টা আক্রমণের কাউন্টার অ্যাটাকের আশঙ্কায় আমরা অতিরিক্ত ঝুঁকি নিতে পারিনি।’ কোচের এই অতি-সতর্ক নেতিবাচক মানসিকতা এবং ম্যাচের মাঝপথে কার্যকর কৌশলগত পরিবর্তন আনতে না পারার খেসারত দিতে হয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।

স্কোয়াডে প্রতিভার কমতি না থাকলেও নকআউট পর্বের চরম স্নায়ুচাপ সামলানোর ক্ষেত্রে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারদের অভিজ্ঞতার ঘাটতি ছিল স্পষ্ট। পেনাল্টি মিসের ধাক্কা সামলে ওঠা, সহজ সুযোগ নষ্টের হতাশা আর শেষ মুহূর্তের গোল হজম করার পর দ্রুত ম্যাচে ফেরার তাড়াহুড়োয় দলটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। মাঠের ভেতর তরুণদের পথ দেখানোর মতো কোনো অভিজ্ঞ নেতৃত্বের দেখা মেলেনি। অন্যদিকে, নরওয়ে পুরো সময় নিজেদের স্নায়ু ধরে রেখে বাস্তববাদী ফুটবল খেলেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো নিজেদের পক্ষে এনে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কেটেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top