শ্রেণিকক্ষে হাসিমুখ, ঘরে নীরব কান্না

মোঃ জামাল উদ্দিন

সকালে বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগে একজন শিক্ষক আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলেন। কারণ শ্রেণিকক্ষে শত শত শিক্ষার্থীর সামনে তাঁর বিষণ্ন মুখ নয়, আশাবাদের আলো ছড়ানো মুখটাই প্রয়োজন; কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক নির্মম বাস্তবতা—মাসের পর মাস প্রাপ্য বেতন না পাওয়ার কষ্ট।

এমপিওভুক্ত মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের অভিযোগ, গত মে মাসের বেতন এখনো পরিশোধ না হওয়ায় তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। সংসারের প্রতিটি ব্যয় যেন এখন এক একটি অমীমাংসীত প্রশ্ন। ঘরের বাজার, সন্তানের পড়াশোনা, বৃদ্ধ মা-বাবার চিকিৎসা, বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ বিল—সবকিছুই অনিশ্চয়তার ভারে নুয়ে পড়েছে।

একজন শিক্ষক হয়তো সারাদিন শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখতে শেখান; কিন্তু বাড়ি ফিরে যখন সন্তান বলে, ‘বাবা, সবাই আম খাচ্ছে, আমিও একটা আম খাব’—তখন সেই বাবা নীরবে সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। কারণ তাঁর পকেটে তখন একটি আম কেনার মতো টাকাও নেই। সেই নীরব মুহূর্তে একজন শিক্ষকের বুকের ভেতর যে কান্না জমে ওঠে, তা কোনো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

শুধু একটি আম নয়—অনেক শিক্ষক অসুস্থ মায়ের ওষুধ কিনে দিতে পারছেন না, বাবার ভাঙা চশমা বদলাতে পারছেন না, সন্তানের প্রয়োজনীয় বই-খাতা কিনতে পারছেন না। তবুও তাঁরা প্রতিদিন সময়মতো প্রতিষ্ঠানে যান। শিক্ষার্থীদের শেখান সততা, ন্যায়বিচার, দেশপ্রেম ও মানবিকতার শিক্ষা। নিজের অভাবকে কখনোই দায়িত্ব পালনের অজুহাত হতে দেন না।

শিক্ষক সমাজের দাবি, তারা কোনো অনুদান কিংবা করুনা চান না। তারা শুধু তাদের অর্জিত প্রাপ্য বেতন সময়মতো চান। কারণ একটি পরিবারের সম্মান, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অনেকাংশেই সেই বেতনের ওপর নির্ভরশীল।

শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষকের আর্থিক নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা মানে শুধু একজন কর্মচারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করা। যে শিক্ষক আর্থিক অনিশ্চয়তায় থাকেন, তাঁর ওপর মানসিক চাপ বাড়ে, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা ব্যবস্থার ওপরও পড়তে পারে।

এমপিওভুক্ত মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি দ্রুত বকেয়া বেতন পরিশোধ এবং ভবিষ্যতে নির্ধারিত সময়ে বেতন নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন।

কারণ একজন শিক্ষক যখন নিজের পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থতার কষ্ট বুকে নিয়ে শ্রেণিকক্ষে দাঁড়ান, তখন শুধু একজন মানুষের নয়—একটি জাতির বিবেকও নীরবে কেঁদে ওঠে। জাতি গড়ার কারিগরের চোখে যেন আর অশ্রু না থাকে—এটাই আজ সময়ের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

 

মোঃ জামাল উদ্দিন : সাংবাদিক, ভোলা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top