মোহাম্মদ ইউসুফ
কিছু মানুষ পৃথিবীতে এমনভাবে বিচরণ করেন, যাদের কর্ম, আদর্শ, স্নেহ ও মানবিকতা মৃত্যুর পরও মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে। মরহুম অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম মোঃ বশিরুল্লাহ (রাহিমাহুল্লাহ) ছিলেন তেমনই একজন বিরল ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন একাধারে একজন প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, সফল জনপ্রতিনিধি, দক্ষ সংগঠক, খ্যাতিমান আলেমে দ্বীন এবং জনমানুষের অকৃত্রিম বন্ধু। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করছি।
১৯৫৩ সালে বরিশাল জেলার তৎকালীন হিজলা উপজেলা ও বর্তমান মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের নলগোড়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মরহুম খলিলুর রহমান ও মাতা মরহুমা হাজেরা খাতুনের স্নেহ-মমতায় বেড়ে ওঠা এই মানুষটি ছোটবেলা থেকেই শিক্ষা, নৈতিকতা ও দ্বীনি মূল্যবোধের প্রতি অনুরাগী ছিলেন।
নিজ গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষা জীবন শুরু করে তিনি নপাইয়া হোগলটুরী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল, আলিম ও ফাজিল এবং পরবর্তীতে ছারছিনা দারুসসুন্নাহ কামিল মাদ্রাসা থেকে কামিল ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৬ সালে নপাইয়া হোগলটুরী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় শিক্ষকতা পেশায় যোগদানের মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সাল থেকে অবসর গ্রহণ পর্যন্ত বাহেরচর ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থীকে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন।
তাঁর সান্নিধ্যে আসা অসংখ্য মানুষের মতো আমিও তাঁর স্নেহধন্য ছাত্রদের একজন। আমার জীবনের সঙ্গে তাঁর অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে আছে, যা আজও হৃদয়কে আলোড়িত করে।
আমার প্রিয় পিতা ইন্তেকাল করার পর তিনি শুধু জানাজা ও দাফনের দায়িত্ব পালন করেই ক্ষান্ত হননি; বরং একজন অভিভাবকের মতো দীর্ঘদিন আমার খোঁজখবর নিয়েছেন। অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত নিয়মিত ফোন করে খোঁজ নিতেন, পরামর্শ দিতেন এবং উৎসাহ জোগাতেন। তাঁর সেই স্নেহ ও আন্তরিকতা আজও গভীরভাবে অনুভব করি।
আমার পিতার সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল। সে সুবাদে তিনি যখনই আমাদের এলাকায় মাহফিলে আসতেন, প্রায়ই আমাদের বাড়িতে যেতেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা সমাপ্ত করার পর তাঁরই উৎসাহ ও উদ্যোগে আমি বাহেরচর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাই। লজিংয়ের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত তিনি আমাকে নিজের বাড়িতে স্থান দিয়েছিলেন। তিনি শুধু আশ্রয়ই দেননি, বরং নিজের সন্তানের মতো স্নেহে আগলে রেখেছিলেন। খাবারের সময় ডাক দিয়ে পাশে বসিয়ে খাওয়াতেন, খোঁজখবর নিতেন এবং পড়াশোনার প্রতি যত্নবান হতে উৎসাহিত করতেন।
দীর্ঘ বারো বছর তাঁর প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নের সৌভাগ্য আমার হয়েছে। এ সময়ে শিক্ষকের চেয়ে বেশি একজন অভিভাবক হিসেবেই তাঁকে পেয়েছি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাহফিল ও দ্বীনি অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে সফর করার সুযোগ হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, জীবনাচরণ, মানুষের সঙ্গে ব্যবহার এবং দ্বীনের প্রতি নিষ্ঠা কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার জীবনের এক অমূল্য সম্পদ।
জনপ্রতিনিধি হিসেবেও তাঁর জীবন ছিল বর্ণাঢ্য। ১৯৮৪ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচবার গোবিন্দপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে তিনি মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। তিনি হিজলা উপজেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর নিত্যদিনের অভ্যাস। অনেক মানুষ আজও তাঁর ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা ও মানবিক আচরণের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
তিনি হিজলা উপজেলা পরিষদ জামে মসজিদের খতিব ছিলেন এবং জাতীয় ইমাম সমিতির হিজলা উপজেলা সভাপতি ও বরিশাল জেলার সহ-সভাপতি ছিলেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষক পরিষদের হিজলা উপজেলা সভাপতি ও বরিশাল জেলা শাখার সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী হিজলা উপজেলা আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দ্বীনের দাওয়াত, ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এবং নৈতিক সমাজ গঠনে তিনি নিরলসভাবে কাজ করেছেন।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগে আক্রান্ত হন। দীর্ঘ সময় ঢাকায় চিকিৎসা ও নিয়মিত ডায়ালাইসিস চললেও তাঁর মন পড়ে থাকত গ্রামের বাড়িতে, আপনজনদের মাঝে। শেষ জীবনে তিনি বারবার বাড়িতে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করতেন। তার পরিবারের সদস্যরা তাঁর সেই ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানিয়ে তাঁকে গ্রামের বাড়ি হিজলা উপজেলার বাহেরচর গ্রামে নিয়ে আসে। সেখানে পরিচিত মানুষ, প্রিয় পরিবেশ ও আত্মীয়-স্বজনের সান্নিধ্যে তিনি যেন এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি খুঁজে পেয়েছিলেন।
অসুস্থতার মধ্যেও তিনি নামাজ, দোয়া এবং আল্লাহর স্মরণে নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন। পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নেওয়া, আগতদের সঙ্গে কথা বলা এবং সবার জন্য দোয়া করা ছিল তাঁর নিয়মিত অভ্যাস। শারীরিক দুর্বলতা তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি; বরং শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে ছিলেন।
২০২৫ সালের ৩১মে বরিশাল থেকে ডায়ালাইসিস শেষে তিনি বাড়িতে ফিরে আসেন। পরদিন ১ জুন ভোররাতে মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন। তার চলে যাওয়া আমাদের ওপর নেমে আসে এক অপূরণীয় শূন্যতা। আমরা হারিয়েছি এমন প্রিয়জনকে যিনি ছিলেন আমাদের প্রজ্ঞাবান অভিভাবক।
জীবনের শেষ সময়েও তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ থেকে কিছুটা সেবা করার সুযোগ মহান আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন। এটি আমার জীবনের অন্যতম বড় সৌভাগ্য ও প্রাপ্তি বলে মনে করি।
তাঁর ইন্তেকালের আগের দিনও কিছু সময় তাঁর সান্নিধ্যে থাকার সুযোগ হয়েছিল। দীর্ঘ অসুস্থতার মধ্যেও তিনি আমাকে চিনতে পেরেছিলেন এবং আগের মতোই স্নেহভরে ডাক দিয়েছিলেন। সেই ডাক, সেই মমতা এবং সেই আন্তরিকতা আজও হৃদয়ে অনুরণিত হয়। একজন শিক্ষক, অভিভাবক ও পথপ্রদর্শক হিসেবে তিনি আমার জীবনে যে অবদান রেখে গেছেন, তা কখনো ভোলার নয়।
আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর স্নেহ, শিক্ষা, আদর্শ ও দিকনির্দেশনা আমার মতো অসংখ্য ছাত্রের হৃদয়ে চিরজাগরুক হয়ে থাকবে। তাঁর হাতে গড়া মানুষগুলোই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন এবং তাঁর জন্য চলমান সদকায়ে জারিয়ার অন্যতম মাধ্যম।
তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করছি। মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে প্রার্থনা, তিনি যেন মরহুম অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম মোঃ বশিরুল্লাহ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর জীবনের সকল খেদমত কবুল করেন, তাঁর কবরকে জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগানে পরিণত করেন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউসের সর্বোচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেন, আমিন।
লেখক : সাংবাদিক




