বিএনপি নেতার সঙ্গে নারী শিক্ষকের হাতাহাতি, নেপথ্যে কী

বরিশাল জার্নাল ডেস্ক

রাজশাহীর দুর্গাপুরে দাওকান্দি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ডিগ্রি পরীক্ষা চলাকালে হামলা, ভাঙচুর ও শিক্ষক মারধরের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় কলেজের অধ্যক্ষসহ পাঁচজন আহত হয়েছেন। ‘চাঁদা না পেয়ে’ এ হামলা হয়েছে বলে অভিযোগ কলেজ কর্তৃপক্ষের।

 

বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) দুপুর আড়াইটার দিকে ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা চলাকালে এ ঘটনা ঘটে।

 

হামলায় আহতরা হলেন কলেজ অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক, নারী প্রভাষক আলেয়া খাতুন হীরা, অধ্যাপক রেজাউল করিম আলমসহ কলেজের আরও দুই কর্মচারী।

 

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুরের দিকে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা কলেজের অধ্যক্ষের কক্ষে প্রবেশ করে। নানা বিষয় নিয়ে অধ্যক্ষসহ অন্যান্য শিক্ষকদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়ান বিএনপির নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে কলেজের আয়-ব্যয়ের হিসাব চান তারা। এ নিয়ে তাদের মধ্য কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তারা প্রভাষক আলেয়া খাতুন হীরাকে মারধর করেন। এর জের ধরে ক্যাম্পাসে ওই নারী শিক্ষক বিএনপি নেতা আকবর আলীর ওপর হামলা করে। এর কিছুক্ষণ পর বিএনপির নেতাকর্মীরা গিয়ে অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাকসহ কয়েকজন শিক্ষকের ওপর হামলা চালান। এ সময় অফিস কক্ষে ব্যাপক ভাঙচুরও করা হয়।

 

আহত শিক্ষকরা অভিযোগ করে বলেন, কলেজে ওই সময় ২০২৪ সালের ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা চলছিল। ফলে পরীক্ষাকেন্দ্র বিবেচনায় কলেজ ও আশপাশের ১০০ গজের মধ্যে ১৪৪ ধারা জারি করেছিলেন প্রশাসন। এরইমধ্যে জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আকবর আলী, জয়নগর ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ড ব্রহ্মপুর গ্রামের বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আফাজ আলী, ইউনিয়ন বিএনপি নেতা ও মৎস্য ব্যবসায়ী শাহাদ আলী, জয়নগর ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি জয়নাল আলী, ৪নং ওয়ার্ড দাওকান্দি বিএনপির সভাপতি এজদার আলী, জয়নগর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি রুস্তম আলী, ছাত্রদল নেতা জামিনুর ইসলাম জয়সহ স্থানীয় ও ইউনিয়ন বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীর কলেজে প্রবেশ করে শিক্ষকদের ওপর চড়াও হয়।

 

এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ কয়েকটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, শিক্ষক আলিয়া বিএনপি কর্মী শাহাদ আলীর মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে ওই শিক্ষক বিএনপি নেতাকে থাপ্পড় মারেন। পরবর্তীতে ওই বিএনপি নেতা নিজের জুতা খুলে ওই নারী শিক্ষককে পেটাতে থাকেন। পরবর্তীতে কলেজে মাঠে আবারও ওই শিক্ষক অপর বিএনপি নেতা আফাজ আলীকে ফেলে মারধর করেন। অপর একটি ছবি ভাইরাল হয় সেখানে ওই শিক্ষককে রক্তাক্ত দেখা যায়। এসব ভিডিও মুহূর্তে ভাইরাল হলে নেটিজেনরা করছেন নানান আলোচনা-সমালোচনা।

ইউনূস রানা নামে একজন ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর কমেন্টে লিখেছেন, ‘এই শিক্ষক আগে হাত তুলেছেন। অন্যয় প্রথম শিক্ষক করেছেন।’ আব্দুর রশিদ খান নামে একজন লিখেছেন, ‘শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন আগের মতোই বহাল থাকল।’ আহম্মেদ আলী নামে আরেকজন লিখেছেন, ‘সবাই নীরব দর্শকের মতো দেখছে। কেউ মাঝে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে না। এমনকি প্রিন্সিপালেরও কোনো সক্রিয় ভূমিকা নেই।’

 

বিএনপি কর্মী ও মৎস ব্যবসায়ী শাহাদ আলী জানান, কলেজের পুকুরের ১৭ শতাংশ জমি রয়েছে। যেখানে মাছ চাষ করা হয়। দু’বছরের লিজের টাকা কলেজ কর্তৃপক্ষ আমার কাছে পাবে। সেই টাকা দিতে গেলে দেখি সেখানে স্থানীয় বিএনপি নেতারা তাফসির মাহফিলের দাওয়াতপত্র নিয়ে গেছে। শুরু থেকে তাদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা চলছিল। হিরা নামে ওই শিক্ষক আমাকে মনে করে তাদের সঙ্গে আমিও এসেছি ভেবে আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে গালে চড় মারলে সহ্য করতে না পেরে আমিও জুতাপেটা করি।

 

৪নং ওয়ার্ড ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ইজদার আলী বলেন, আমরা ১৫-২০ জন গিয়েছিলাম অধ্যক্ষকে তাফসিরের দাওয়াত দিতে। এ সময় কলেজের শিক্ষক আলেয়া খাতুন হীরা প্রথমে নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজ আখ্য দিয়ে ভিডিও করতে থাকেন। মানা করলে আমাদের গালিগালাজ করে পরবর্তীতে কয়েকজনকে চড়-থাপ্পড় মারেন। যার ফলশ্রুতিতে নেতাকর্মীরা ক্ষিপ্ত হয়ে কয়েকজন শিক্ষককে মারধর করেছে।

 

অধ্যক্ষ আলেয়া খাতুন হীরা অভিযোগ করেন, বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে প্রায় কলেজে এসে হিসাব-নিকাশ চাইতেন। আসলে তারা চাঁদার দাবিতে আসতো। অধ্যক্ষ নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন। বিধায় কোনো পক্ষকেই সেইভাবে গ্রহণ করতেন না। এটাই অপরাধ ছিল অধ্যক্ষের। আর একজন শিক্ষক বা সহকর্মী হিসেবে অধ্যক্ষের পাশে থাকাটাই আমার অপরাধ। আমি এখানকার স্থানীয় বাসিন্দা হয়েও কেন অধ্যক্ষের পক্ষ নিয়েছি এটাও আমার একটা অপরাধ।

 

এদিকে শিক্ষকের সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনায় জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আকবর আলীকে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যসহ সব পর্যায়ের দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

 

অভিযুক্ত বিএনপি নেতা আকবর আলী দাবি করেন, কলেজের আগের বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির হিসাব চাইতে গেলে উল্টো তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়। তার অভিযোগ, শিক্ষক আলেয়া খাতুন হীরা প্রথমে আমাদের ওপর হামলা করেন। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

 

প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক জানান, তিনি সরকারি আদেশে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তার কাছে বিভিন্ন সময় কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে আসছিল বিএনপির কয়েকজন নেতা। সর্বশেষ চাঁদা না দেওয়ার কারণে তার ওপর হামলা হয় বলে দাবি করেন অধ্যক্ষ।

 

এ বিষয়ে দুর্গাপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম বলেন, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আশঙ্কায় পুলিশ আগে থেকেই সেখানে উপস্থিত ছিল। তবে কিছু লোক জোরপূর্বক প্রবেশ করে হামলা-ভাঙচুর চালায়। এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এশিয়া পোস্ট

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top