তাসফিয়া জান্নাহ তুবা
জীবনটা তখনই সুন্দর ছিল,যখন সকাল ৬ টা বাজে উঠে ৭ টায় স্কুলে যেতাম। স্কুলের পরে হয়তো কোচিং,আর নয়তো বাসায় এসে গোসল, খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ঘুম! কখনো হয়তো আম্মুর জোরাজুরিতে,আর নাহলে নিজের ক্লান্তি থেকেই;তবে মাথায় এই টেনশন রয়েই যেতো যে কখন উঠবো আর বন্ধুদের সাথে খেলতে বের হবো।
সারা বিকেল খেলাধুলা করে ক্ষুধার্ত হয়ে বাসায় ফিরতাম। আম্মু কমপ্লান/হরলিক্স বানিয়ে দিত। খাওয়া শেষে নিজের ইচ্ছাতেই পড়তে বসে যেতাম। পড়া শেষ হলেই আম্মু ভাত খাইয়ে দিত, আর বসে বসে কার্টুন দেখতাম.. এরপর আব্বু-আম্মুকে জড়িয়ে ধরে শান্তির ঘুম। ওই সময়ে discipline, Productivity শব্দগুলোর সাথে সেভাবে পরিচয় না থাকলেও জীবনে সেসব ভালোভাবেই বিদ্যমান ছিল; কিন্তুআজ এতকিছু জেনেও অলস হয়েই পড়ে থাকি সারাদিন।
তখনকার ঈদগুলোতে কখনোই বলার প্রয়োজন হয়নি যে, এবারের ঈদ খারাপ গিয়েছে। নতুন জামা-জুতা,নানাবাড়ি/দাদাবাড়ি বেড়াতে যাওয়া,ব্যাগভর্তি সালামি, আম্মুর হাতের মজার মজার খাবার- জীবনের সেরা ঈদ গুলো তখনই উদযাপন করেছি। প্রতি বছর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম ডিসেম্বর কখন আসবে,কখন শীত নামবে আর কখন বেড়াতে যাবো, সোয়েটার পড়বো,পিঠা খাবো।
এত সুন্দর ডিসেম্বর শেষ হয়ে নতুন বছরের জানুয়ারি মাস চলে আসুক তা কখনোই চাইতাম না। তবে জানুয়ারি মাসেও এক প্রকার আনন্দ ছিলো। নতুন নতুন বই, আম্মুর কিনে দেয়া নতুন ব্যাগ, আরো কত কি! আব্বু-আম্মু,পরিবারের সবাই,কারো ভালবাসারই কমতি ছিল না। এখনকার মত একাকিত্ব তখন ছিলো না। ওই সময় যারাই বন্ধু ছিল সবাইকেই বেস্ট ফ্রেন্ড মনে হতো,কে টক্সিক, কে বিট্রে করবে এসব নিয়ে তখন মাথাব্যথা ছিল না।
পারফেকশনিস্ট হওয়ার প্রতিযোগিতাও তেমন ছিল না।পরীক্ষার রেজাল্ট এর সময় ১ নম্বর কম আসবে কিনা এটা ভেবে কান্না চলে আসতো,আর এখন পাশ হবে নাকি ফেইল তা নিয়ে চিন্তা করতে হয়।
মোবাইল ফোন আসক্তি, হতাশা- এগুলো তো আমাদের ডিকশনারিতেই ছিল না। প্রতিদিন এত আফসোস কিংবা অতিরিক্ত চিন্তা করার সময়ই ছিল না।কপালে যাই ছিল তা নিয়েই সন্তুষ্ট ছিলাম। এইতো ছিল জীবন!
বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে মনে হয়, তখন দুনিয়াবি স্বর্গে বসবাস করতাম। এমনও না যে তখন দুঃখ-কষ্ট ছাড়া একদম সুখের জীবন ছিল। অন্তত একদিনের দুঃখকে কেন্দ্র করে পুরো বছরকে খারাপ করে ফেলতাম না।
সময় অপচয়ের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নামক জিনিসটিরও তেমন ব্যবহার ছিল না। কিছুটা হলেও তখন মানুষের মধ্যে সততা, নম্রতা বজায় ছিল। নিজধর্ম পরিচয় ভুলে অন্য পথে পা বাড়াতে গেলে কেউ ১ বার হলেও ভাবতো; আজ সেই সোনালী সময়গুলোর কথা ভেবে বুকের ভেতরটা হাহাকার করে, শত চাইলেও তখনকার সেই স্নিগ্ধ, সুন্দর পরিবেশ ফিরে আসবে না।
দুনিয়াটা এখন যান্ত্রিক। পাপে পরিপূর্ণ আর অমানবিক।
তাসফিয়া জান্নাহ তুবা
শিক্ষার্থী : একাদশ শ্রেণি
সরকারি মহিলা কলেজ, বরিশাল




