গাজার ধ্বংসস্তূপের পাশে ২৫০ জুটির গণবিয়ে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ, বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবু আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই গাজায় একসঙ্গে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন ২৫০ জুটি। ইসরায়েলের হামলায় বিপর্যস্ত উপত্যকাটিতে এমন আয়োজন নতুন জীবনের আশা ও ভালোবাসার প্রতীক হয়ে উঠেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের মানবিক সহায়তা মিশন ‘অপারেশন গ্যালান্ট নাইট ৩’-এর উদ্যোগে এ গণবিয়ের আয়োজন করা হয়।

গাজার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা বর-কনেরা এ অনুষ্ঠানে অংশ নেন। আয়োজকদের ভাষায়, অবরুদ্ধ উপত্যকায় ভালোবাসা ও নতুন শুরুর বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল এ আয়োজনের উদ্দেশ্য। চারদিকে ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবন ও বাস্তুচ্যুত মানুষের অস্থায়ী আশ্রয়শিবিরের মধ্যে বিয়ের উৎসবে যোগ দেন গাজাবাসী।
ঐতিহ্যবাহী আরব পোশাকে এক নববধূ। ছবি / রয়টার্স৬ নভেম্বর শুক্রবার গাজা সিটির সমুদ্রতীরবর্তী মেরিটাইম ক্লাবে এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। বর-কনেদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন। কনেরা সাদা বিয়ের পোশাক ও হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে আসেন। বরদের পরনে ছিল গাঢ় রঙের স্যুট। অনেকের গলায় ছিল ফিলিস্তিনের ঐতিহ্যবাহী কেফিয়াহ। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি সংগীত ও আনন্দ-উৎসবের আয়োজনও ছিল।

যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও অর্থনৈতিক সংকটে গাজার অনেক জুটির বিয়ের পরিকল্পনা পিছিয়ে গেছে। বহু মানুষের ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে, হারিয়েছেন জীবিকা ও আয়ের পথ। এমন পরিস্থিতিতে বিয়ের আয়োজনের খরচ বহন করাও তরুণ-তরুণীদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। গণবিয়ের মাধ্যমে সেই আর্থিক বোঝা কিছুটা কমানো এবং নতুন সংসার শুরু করতে সহায়তা করাই ছিল আয়োজকদের লক্ষ্য।
ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে গাজা সিটিতে এক দম্পতি। ছবি : রয়টার্সআয়োজক কমিটির তথ্য অনুযায়ী, অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ১১ হাজার ৬২২ জন আবেদন করেছিলেন। যাচাই-বাছাইয়ের পর ১ হাজার ৩৩৫ জনকে চূড়ান্ত লটারির জন্য নির্বাচিত করা হয়। সেখান থেকে ২৫০ জন বরকে বেছে নেওয়া হয়। তাঁদের সঙ্গে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন ২৫০ কনে। ‘থোব আল ফারাহ’ বা ‘আনন্দের পোশাক’ উদ্যোগের তৃতীয় পর্ব ছিল এ আয়োজন।

গাজায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ‘অপারেশন গ্যালান্ট নাইট ৩’ পরিচালিত হচ্ছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে শুরু হওয়া এ কর্মসূচির আওতায় খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা পাঠানো হচ্ছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ও অন্যান্য প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এ কর্মসূচির মাধ্যমে গাজায় ১ লাখ ৩৬ হাজার টনের বেশি সহায়তা পাঠানো হয়েছে। এর আর্থিক মূল্য ৪১৬ কোটি ডলারের বেশি।
সমুদ্র সৈকতের কাছে সেলফি তুলছেন এক দম্পতি। ছবি : রয়টার্সগাজায় ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও সংঘাত পুরোপুরি থামেনি। প্রায় প্রতিদিনই ইসরায়েলি বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। চলমান হামলা ও সামরিক তৎপরতায় বেসামরিক মানুষের জীবন এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার মধ্য দিয়ে গাজা যুদ্ধ শুরু হয়। ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এর জবাবে গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ইসরায়েলি অভিযানে এখন পর্যন্ত ৭৪ হাজার ৬৪০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
গণবিয়ে দেখতে জড়ো হয়েছিলেন হাজারো গাজাবাসী। ছবি / রয়টার্সযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ২৫০ জুটির এ বিয়ে তাই শুধু একটি উৎসব নয়, বরং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আকাঙ্ক্ষারও প্রকাশ। তবে এক দিনের আনন্দ গাজাবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ, বাস্তুচ্যুতি ও নিরাপত্তাহীনতা দূর করতে পারবে না। যুদ্ধবিধ্বস্ত উপত্যকাটিতে স্থায়ী শান্তি ও পুনর্গঠনের পথ এখনো অনিশ্চিত।

সূত্র : আলজাজিরা ও বিবিসি

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top