‘সোনার ডিম পাড়া হাঁসকে মেরে ফেলবেন না’, নাহিদকে নিয়ে বিশপের সতর্কবার্তা

বরিশাল জার্নাল ডেস্ক

ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে বল করার সামর্থ্য। সঙ্গে উচ্চতা ও বাড়তি বাউন্স। এমন একজন পেসার যেকোনো দলের জন্যই বড় সম্পদ। বাংলাদেশের নাহিদ রানাকে তাই বিশ্ব ক্রিকেটের সম্ভাব্য সুপারস্টার হিসেবে দেখছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক ফাস্ট বোলার ইয়ান বিশপ। তবে তরুণ এই পেসারের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাংলাদেশকে সতর্কও করেছেন তিনি। তাৎক্ষণিক সাফল্যের আশায় নাহিদকে দ্রুত মাঠে ফেরানোর চেষ্টা করলে দীর্ঘমেয়াদে বড় ক্ষতি হতে পারে বলে মনে করেন ক্যারিবীয় কিংবদন্তি। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তার পরামর্শ, সোনার ডিম পাড়া হাঁসকে যেন মেরে ফেলা না হয়।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নাহিদকে নিয়ে এসব কথা বলেন বিশপ। বাংলাদেশ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যকার চলমান টেস্ট সিরিজে ধারাভাষ্য দিতে ঢাকায় এসেছেন সাবেক এই ক্যারিবীয় পেসার। বাংলাদেশের পেস আক্রমণের উন্নতি নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও নাহিদের দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে থাকার বিষয়টি তাকে ভাবাচ্ছে।

বিশ্ব ক্রিকেটে নাহিদের সম্ভাবনা কতটা, সেটি বোঝাতে গিয়ে বিশপ বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, নাহিদ বিশ্ব ক্রিকেটের সম্ভাব্য সুপারস্টারদের একজন। বিশ্বজুড়ে তরুণ ফাস্ট বোলারদের দিকে তাকালে দেখবেন, নাহিদ তাদের অনেকের সমান কিংবা আরও বেশি গতিতে বল করতে পারে।’

বিশপের মতে, এমন একজন প্রতিভাবান পেসারকে পাওয়াই যথেষ্ট নয়। দীর্ঘ সময় তাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলানোর জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিচর্যা। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দ্রুত ফেরানোর চেয়ে পুরোপুরি সুস্থ করে তোলাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘নাহিদের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। তাৎক্ষণিক সাফল্যের আশায় সোনার ডিম পাড়া হাঁসটিকে মেরে ফেলবেন না।’

গত জুলাইয়ে জিম্বাবুয়ে সফরে শরীরের পাশের পেশিতে গ্রেড-২ স্ট্রেইনের চোট পান নাহিদ। সেই চোটের কারণে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ থেকে ছিটকে যান তিনি। এরপর এশিয়ান গেমস ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্টেও খেলতে পারেননি। পুনর্বাসনের সময় নতুন করে শারীরিক জটিলতা দেখা দেওয়ায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত ওয়ানডে ত্রিদেশীয় সিরিজ থেকেও ছিটকে যান এই পেসার।

দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে থাকার পর নাহিদের কোমরের নিচের অংশ ও পেলভিক অঞ্চলে দুর্বলতা এবং ব্যথার সমস্যা দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত উন্নত চিকিৎসা ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে তাকে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।

সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নাহিদের ল্যাব্রাম টিয়ার শনাক্ত হওয়ার কথা জানিয়েছে ক্রিকেটবিষয়ক ওয়েবসাইট ক্রিকবাজ। বিসিবির এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাহিদকে ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে এবং তার পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামী শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) থেকে আবার বোলিং শুরু করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে অনুশীলনে ফেরা মানেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলার মতো পুরোপুরি ফিট হয়ে ওঠা নয়।

চোটের কারণে চলমান ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্ট সিরিজেও খেলতে পারছেন না নাহিদ। আগামী নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে তার অংশগ্রহণ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিশেষ করে সফরের প্রথম টেস্টে তাকে পাওয়া কঠিন হতে পারে বলে ক্রিকবাজকে জানিয়েছেন বিসিবির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা।

নাহিদের অস্ট্রেলিয়া সফরে খেলতে না পারায় হতাশা প্রকাশ করেছেন বিশপ। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার বাউন্সি উইকেটে বাংলাদেশের এই তরুণ পেসারকে দেখার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি।

বিশপ বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার বাউন্সি উইকেটে তাকে বোলিং করতে দেখার জন্য আমি মুখিয়ে ছিলাম। তাই শেষ পর্যন্ত তাকে দেখতে না পেরে হতাশ হয়েছি। তবে তার সুস্থতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার পরও তাকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরাতে তাড়াহুড়ো করা উচিত নয়। কারণ দ্রুতগতির বোলিং শরীরের ওপর প্রচণ্ড চাপ ফেলে।’

নিজের ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতা থেকেই এমন পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক ক্যারিবীয় ফাস্ট বোলার। একসময় বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম ভয়ংকর পেসার হিসেবে পরিচিতি পেলেও বারবার স্ট্রেস ফ্র্যাকচারের কারণে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছে তাকে। শেষ পর্যন্ত চোটই তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে অনেকটা সংক্ষিপ্ত করে দেয়।

বিশপ মনে করেন, দ্রুতগতির বোলারদের শরীরের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে। কারও কারও শরীর স্বাভাবিকভাবেই চোটের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হতে পারে। তাই নাহিদের ক্ষেত্রে শুধু চিকিৎসা নয়, শক্তি ও কন্ডিশনিং অনুশীলনের দিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে।

এ ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ার পেসারদের উদাহরণ দিয়েছেন বিশপ। মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্স ও জশ হ্যাজলউডের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের পেছনে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার চিকিৎসা ও ফিটনেস ব্যবস্থাপনার বড় ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। স্কট বোল্যান্ডের দীর্ঘ সময় সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলে যাওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন ক্যারিবীয় কিংবদন্তি।

বিশপের মতে, নাহিদের শরীরকে এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে দীর্ঘ সময় দ্রুতগতির বোলিংয়ের ধকল সামলাতে পারেন তিনি। এ জন্য শক্তি বাড়ানোর অনুশীলনের পাশাপাশি মেডিকেল বিভাগের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

বাংলাদেশের প্রধান কোচ ফিল সিমন্সের অভিজ্ঞতার ওপরও আস্থা রয়েছে বিশপের। দীর্ঘদিনের পরিচিত এই ক্যারিবীয় কোচকে বড় ভাইয়ের মতো দেখেন তিনি। দ্রুতগতির বোলারদের শারীরিক চাপ সম্পর্কে সিমন্স ভালোভাবেই অবগত বলে মনে করেন বিশপ।

তার পরামর্শ, কোচিং স্টাফ, ফিটনেস ট্রেনার ও মেডিকেল বিভাগকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরানোর আগে নাহিদের শরীরকে পর্যাপ্ত সময় দিয়ে প্রস্তুত করতে হবে।

বিশপ বলেন, ‘বিশ্বের প্রতিটি দলই নাহিদ রানার মতো একজন পেসার চায়। তাই তাকে সুস্থ রাখতে হবে।’

শুধু নাহিদ নন, বাংলাদেশের পুরো পেস আক্রমণের উন্নতিতেও মুগ্ধ ক্যারিবীয় কিংবদন্তি। বিশেষ করে হাসান মাহমুদের বোলিংয়ের নিয়ন্ত্রণ এবং ধারাবাহিকভাবে নির্দিষ্ট জায়গায় বল ফেলার দক্ষতার প্রশংসা করেছেন তিনি।

ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেটে কেন্টের হয়ে হাসানের খেলার প্রসঙ্গও টেনেছেন বিশপ। তার মতে, কেন্টে খেলার সুযোগ পেয়ে হাসান ভালো বোলার হয়ে ওঠেননি। বরং আগে থেকেই দক্ষ বোলার ছিলেন বলেই তাকে দলে নিয়েছিল কাউন্টি ক্লাবটি।

মিরপুর টেস্টে হাসানের বোলিংয়ের সময় তিনটি স্লিপ ও একটি গালি ফিল্ডার রাখার দৃশ্যটিও বিশপের নজর কেড়েছে। একসময় এমন আক্রমণাত্মক ফিল্ডিং অস্ট্রেলিয়া কিংবা ওয়েস্ট ইন্ডিজের শক্তিশালী পেস আক্রমণের সঙ্গে বেশি দেখা যেত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের উন্নতির পেছনে সাবেক বোলিং কোচ ওটিস গিবসন ও শন টেইটের অবদানও উল্লেখ করেছেন বিশপ। তার মতে, টেস্ট ক্রিকেটে দেশের বাইরে সাফল্য পেতে শুধু স্পিনার কিংবা একজন পেসারের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। কার্যকর ও বৈচিত্র্যময় পেস আক্রমণ গড়ে তোলা জরুরি।

এই উন্নতির ধারাবাহিকতায় তাসকিন আহমেদ, হাসান মাহমুদ ও নাহিদ রানাকে একই সঙ্গে বাংলাদেশের পেস আক্রমণে দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন বিশপ।

তিনি বলেন, ‘তাসকিন, হাসান ও নাহিদকে আবার একসঙ্গে মাঠে বোলিং করতে দেখার জন্য আমি অপেক্ষা করছি।’

বাংলাদেশের ক্রিকেটে নাহিদ যে সম্ভাবনা তৈরি করেছেন, সেটি দীর্ঘমেয়াদে কাজে লাগানোর ওপরই জোর দিয়েছেন বিশপ। তাঁর বার্তা স্পষ্ট, অল্প সময়ের সাফল্যের জন্য তরুণ পেসারের ক্যারিয়ার ঝুঁকিতে ফেলা যাবে না। যথাযথ পরিচর্যা পেলে নাহিদ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পেস আক্রমণের অন্যতম বড় ভরসা হয়ে উঠতে পারেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top