কী কী সুযোগ-সুবিধা পান রাষ্ট্রপতি, ক্ষমতাই বা কতটুকু

বরিশাল জার্নাল ডেস্ক

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যা ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ গ্রহণ করবেন তিনি।
তবে রাষ্ট্রপতির পদ ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে জনমনে কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটুকু? বেতন-ভাতার বাইরে তিনি আর কী কী সুবিধা পান?
এসব প্রশ্নের উত্তর জানার আগে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক অবস্থান সম্পর্কে জানা জরুরি। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তি। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রের অন্য সব ব্যক্তির ঊর্ধ্বে রাষ্ট্রপতির অবস্থান। তবে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান হলেও সরকারপ্রধান নন। সরকারের নির্বাহী ক্ষমতা মূলত প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে।
রাষ্ট্রপতির পদটি মর্যাদা ও আনুষ্ঠানিক গুরুত্বের দিক থেকে সর্বোচ্চ হলেও তার নির্বাহী ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে সীমিত। সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির নিজস্ব সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। এছাড়া অধিকাংশ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়।
তবে রাষ্ট্রপতির জন্য রয়েছে বেতন-ভাতার পাশাপাশি সরকারি বাসভবন, গাড়ি ও পরিবহন, চিকিৎসা, বিদেশ সফরের ভাতা, আপ্যায়ন এবং বিমানভ্রমণসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুবিধা। এমনকি রাষ্ট্রপতি পদ ছাড়ার পরও সাবেক রাষ্ট্রপতির জন্য কিছু সুবিধা বহাল থাকে।
মাসিক বেতন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা
রাষ্ট্রপতির আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নির্ধারিত হয়েছে দ্য প্রেসিডেন্টস (রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) (সংশোধন) অ্যাক্টে। বর্তমানে রাষ্ট্রপতির মাসিক বেতন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এই বেতন আয়করমুক্ত।
সর্বশেষ ২০১৬ সালে রাষ্ট্রপতির বেতন বাড়ানো হয়। এর আগে মাসিক বেতন ছিল ৬১ হাজার ২০০ টাকা।
রাষ্ট্রপতির আপ্যায়ন বা এন্টারটেইনমেন্টের জন্যও বার্ষিক ভাতার ব্যবস্থা রয়েছে। এই ব্যয়ের নিরীক্ষা করা হয় না।
বঙ্গভবন সরকারি বাসভবন
রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন বঙ্গভবন। এ বাসভবনের সাজসজ্জা, রক্ষণাবেক্ষণসহ প্রয়োজনীয় ব্যয় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বহন করা হয়।
সরকারি দায়িত্ব পালনের জন্য রাষ্ট্রপতিকে গাড়ি ও প্রয়োজনীয় পরিবহন সুবিধাও দেওয়া হয়। সরকারি কাজে বিদেশ সফরের সময় সরকার নির্ধারিত হারে ভাতা পাওয়ার বিধান রয়েছে।
বছরে ২ কোটি টাকার স্বেচ্ছাধীন তহবিল
রাষ্ট্রপতির জন্য রয়েছে স্বেচ্ছাধীন তহবিল। বছরে এ তহবিলের পরিমাণ ২ কোটি টাকা। রাষ্ট্রপতির বিবেচনায় বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে এই অর্থ ব্যয় করা যায়।
রাষ্ট্রপতি ও পরিবারের বিনা খরচে চিকিৎসা
রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার জন্য বিশেষ সুবিধা রয়েছে। দেশের যেকোনো হাসপাতালে তারা বিনা খরচে চিকিৎসা নিতে পারেন।
চিকিৎসকের পরামর্শে বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজন হলে সেই ব্যয়ও সরকার বহন করে।
বিমানভ্রমণে বছরে ২৭ লাখ টাকার সুবিধা
রাষ্ট্রপতির বিমানভ্রমণের জন্যও বিমাসুবিধা রয়েছে। বর্তমানে এ সুবিধার পরিমাণ বছরে ২৭ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের আগে এই সুবিধার পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ টাকা।
অর্থাৎ, মাসিক বেতনের বাইরে রাষ্ট্রপতির জন্য সরকারি বাসভবন, গাড়ি ও পরিবহন, চিকিৎসা, বিদেশ সফরের ভাতা, আপ্যায়ন এবং বিমানভ্রমণসহ বিভিন্ন সুবিধার ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা কতটুকু
রাষ্ট্রপতির সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি তার সাংবিধানিক ক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দুটি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে বাধ্য নন। এর একটি প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং অন্যটি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সাধারণত সেই দলের সংসদীয় দলের নেতাকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। তবে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় ও পররাষ্ট্রনীতি-সংক্রান্ত বিষয় সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত রাখেন। রাষ্ট্রপতি কোনো বিষয় মন্ত্রিসভার বিবেচনার জন্য পাঠাতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী তা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করেন।
তবে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে কোনো পরামর্শ দিয়েছেন কি না বা দিয়ে থাকলে কী পরামর্শ দিয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো আদালত তদন্ত করতে পারে না।
দণ্ড মওকুফের ক্ষমতাও রয়েছে
রাষ্ট্রপতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতা হলো দণ্ড মার্জনা, স্থগিত, হ্রাস বা মওকুফ করা। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদে এ ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে।
কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কর্তৃপক্ষের দেওয়া দণ্ড রাষ্ট্রপতি নির্দিষ্ট সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে মার্জনা বা কমাতে পারেন।
দায়িত্ব পালনে সাংবিধানিক দায়মুক্তি
দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়মুক্তি রয়েছে। তার কার্যকাল চলাকালে তার বিরুদ্ধে কোনো আদালতে ফৌজদারি মামলা করা যায় না। তাকে গ্রেপ্তার বা কারাগারে পাঠানোর জন্য আদালত থেকে পরোয়ানাও জারি করা যায় না।
তবে রাষ্ট্রপতি সম্পূর্ণভাবে অপসারণের বাইরে নন। সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় তাকে অভিশংসন করা যায়। শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণেও তাকে অপসারণের বিধান রয়েছে।
অভিশংসনের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের স্বাক্ষরযুক্ত অভিযোগ স্পিকারের কাছে জমা দিতে হয়। রাষ্ট্রপতিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হয়। এরপর সংসদের মোট সদস্যের কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে প্রস্তাব পাস হলে তার পদ শূন্য হয়।
শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সংসদীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয় এবং চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত বোর্ডের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার বিধান রয়েছে।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের উদ্যোগের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ঘটনা। ২০০২ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে তার বিরুদ্ধে অভিশংসনের উদ্যোগ নেয়া হলে তিনি পদত্যাগ করেন।
রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর
রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। তবে উত্তরাধিকারী দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি পদে বহাল থাকেন। একই ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ রাষ্ট্রপতি থাকতে পারেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে আবদুল হামিদ পরপর দুই মেয়াদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য থাকেন না। কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে দায়িত্ব গ্রহণের দিন তার সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয়ে যায়।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য ন্যূনতম বয়স ৩৫ বছর হতে হয় এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হয়। তবে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য সংসদ সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
আগে অভিশংসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অপসারিত হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আর রাষ্ট্রপতি হতে পারেন না।
রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান নন
সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান হলেও সরকারের প্রধান নন। সরকারের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে থাকে।
সংসদে কোনো দল স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম থাকে। তবে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে অথবা তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব নেয়ার আগ পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রপ্রধানের পদটির সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, রাষ্ট্রপতির পদটি মর্যাদা ও সাংবিধানিক গুরুত্বের দিক থেকে দেশের সর্বোচ্চ হলেও সংসদীয় ব্যবস্থায় তার নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত। রাষ্ট্রপতির মূল ভূমিকা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করা। এর বিপরীতে সরকারের কার্যকর নির্বাহী ক্ষমতা মূলত প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে।

স্টার নিউজ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top