পর্তুগালকে রুখে দিল ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা কঙ্গো

ক্রীড়া ডেস্ক

লিওনেল মেসির হ্যাটট্রিকের কয়েক ঘণ্টা পর সবার চোখ ছিল ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর দিকে। মেসির মতোই ষষ্ঠ বিশ্বকাপে মাঠে নামলেন পর্তুগিজ তারকা। কিন্তু মেসির রাত যেখানে ইতিহাস ও জয়ে ভরা, রোনালদোর শুরুটা হলো হতাশায়। হিউস্টনে বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘কে’-এর ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করেছে পর্তুগাল।

মঞ্চ প্রস্তুতই ছিল ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জন্য। হিউস্টনের স্টেডিয়াম পর্তুগালের লাল রঙে ভরা, সামনে ডিআর কঙ্গো, আর রোনালদোর ষষ্ঠ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ। কিন্তু যে রাতটি তাঁর আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় হতে পারত, সেটি শেষ হলো হতাশায়। বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘কে’-তে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করল পর্তুগাল।

পর্তুগালের শুরুটা অবশ্য ছিল স্বপ্নের মতো। ৬ মিনিটেই জোয়াও নেভেসের গোলে এগিয়ে যায় রবার্তো মার্তিনেজের দল। পেদ্রো নেতোর ক্রস থেকে বক্সে ঢুকে নিখুঁত হেড করেন নেভেস। গোলটি দেখে মনে হচ্ছিল, ফেভারিট পর্তুগাল হয়তো সহজ জয়ের পথেই হাঁটছে।

শুরুতে সেই ইঙ্গিতও ছিল। বাঁ দিক দিয়ে পেদ্রো নেতো বারবার জায়গা পাচ্ছিলেন। ডান দিক দিয়ে জোয়াও কানসেলো উঠে গিয়ে আক্রমণে বাড়তি চাপ তৈরি করছিলেন। মাঝমাঠে ব্রুনো ফের্নান্দেস, ভিতিনিয়া, জোয়াও নেভেস ও বার্নার্দো সিলভাদের নিয়ে পর্তুগালের বল দখল ছিল স্পষ্ট। কিন্তু সেই দখল গোলের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি।

রোনালদোও কয়েকবার বক্সে সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। কিছু ক্রস তাঁর কাছে প্রায় পৌঁছেও যাচ্ছিল। কিন্তু শেষ স্পর্শে সেই পুরোনো ধার দেখা যায়নি। ৪১ বছর বয়সেও রোনালদোর উপস্থিতি স্টেডিয়াম ভরাতে পারে, প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে পারে; কিন্তু এই রাতে গোলের সামনে তাঁর সিদ্ধান্ত ও ফিনিশিং পর্তুগালকে জেতানোর মতো ছিল না।

পর্তুগালের আরও বড় সমস্যা ছিল রক্ষণে। রুবেন দিয়াস শুরুর একাদশে না থাকায় দলটির রক্ষণভাগে আগের সেই দৃঢ়তা দেখা যায়নি। ডিআর কঙ্গো ধীরে ধীরে ম্যাচে ফেরে। সেদ্রিক বাকাম্বু আক্রমণে বল ধরে রাখছিলেন, ইয়োয়ানে উইসা ও অন্যরা পাল্টা আক্রমণে পর্তুগিজ রক্ষণকে অস্বস্তিতে ফেলছিলেন।

প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে সেই চাপের ফল পায় ডিআর কঙ্গো। কর্নার থেকে আসা বলে উইসা হেড করে সমতা ফেরান। নেভেসের গোলের মতো এটিও ছিল হেড। পর্তুগালের জন্য বিরতির আগে গোল হজম করা বড় ধাক্কা হয়ে আসে।

বিরতির পর দ্রুত পরিবর্তন আনেন মার্তিনেজ। হলুদ কার্ড দেখা বার্নার্দো সিলভাকে তুলে ফ্রান্সিসকো কনসেইসাওকে নামান তিনি। রিয়াল মাদ্রিদের নতুন সাইনিং হিসেবে ঘোষণার পর প্রথম ম্যাচে বার্নার্দো নিজের ছাপ রাখতে পারেননি। ডিআর কঙ্গোর ঘন রক্ষণ ও মাঝমাঠের চাপের মধ্যে হারিয়ে যান তিনি।

কনসেইসাও নামার পর ডান দিক দিয়ে কিছুটা গতি বাড়ে পর্তুগালের। তাঁর ড্রিবলিং ডিআর কঙ্গোর রক্ষণকে কয়েকবার অস্বস্তিতে ফেলে। রোনালদোর জন্যও সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু যেসব জায়গা থেকে তিনি সাধারণত গোল করেন, সেসব জায়গা থেকেও এই রাতে লক্ষ্যভেদ করতে পারেননি।

কানসেলোরও একটি গোল অফসাইডে বাতিল হয়। অন্যদিকে ডিআর কঙ্গো শুধু রক্ষণ করেই থেমে থাকেনি। বাকাম্বুর একটি সুযোগ পোস্টে লেগে ফিরলে পর্তুগাল বড় বিপদ থেকে বেঁচে যায়। শেষ দিকে রাফায়েল লিয়াও ও গনসালো রামোসকে নামিয়ে আরও আক্রমণাত্মক হওয়ার চেষ্টা করে পর্তুগাল, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত গোল আর আসেনি।

পরিসংখ্যান বলছে, পর্তুগাল বল দখলে অনেক এগিয়ে ছিল। পাসের সংখ্যাতেও তাদের আধিপত্য ছিল বিশাল। কিন্তু ফুটবলের মূল হিসাব গোল। সেখানে ডিআর কঙ্গোই পর্তুগালকে সমানে আটকে রাখে। বরং বিপজ্জনক সুযোগের দিক থেকেও আফ্রিকান দলটি পিছিয়ে ছিল না।

এই ড্র ডিআর কঙ্গোর জন্য বড় অর্জন। ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে তারা প্রথম ম্যাচেই ইউরোপের শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে আটকে দিল। শৃঙ্খলিত রক্ষণ, শারীরিক শক্তি এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণে তারা দেখিয়েছে, গ্রুপ ‘কে’-তে তাদের হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।

আর পর্তুগালের জন্য এটি সতর্কবার্তা। স্কোয়াডে তারকা আছে, অভিজ্ঞতা আছে, বল দখলের ক্ষমতা আছে; কিন্তু আক্রমণে ধার না থাকলে বিশ্বকাপে শুধু নাম দিয়ে ম্যাচ জেতা যায় না। রোনালদোর জন্য রাতটি আরও হতাশার। ষষ্ঠ বিশ্বকাপের শুরুতে তিনি গোলের খুব কাছে গিয়েও ফিরলেন শূন্য হাতে।

বিশ্বকাপ দীর্ঘ পথ। পর্তুগালের সামনে এখনো সুযোগ আছে ঘুরে দাঁড়ানোর। তবে হিউস্টনের রাত তাদের মনে করিয়ে দিল, এই টুর্নামেন্টে কেউ কাউকে সহজে কিছু দেবে না। রোনালদোর শেষ দিকের বিশ্বকাপ অধ্যায় যদি স্মরণীয় করতে হয়, পর্তুগালকে দ্রুতই নিজেদের আক্রমণ ও রক্ষণ দুই জায়গাতেই উত্তর খুঁজে পেতে হবে।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top