মুমিনের জীবন

মাসুম আলভী

জীবন যেখানে যেমন নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর জিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে তারা আমার ইবাদত করবে।’ (সূরা আয-জারিয়াত : ৫৬) মুসলিম উম্মাহর জীবন চলার সংবিধান হলো কুরআন ও হাদিস। এই জীবনের ভিত্তি হলো ঈমান, আল্লাহর ওপর দৃঢ়বিশ্বাস, চিন্তা ও কর্মে তার প্রতিফলন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমার প্রতি যে কিতাব অহি নাজিল করা হয়েছে, তা থেকে তিলাওয়াত করো এবং সালাত কায়েম করো। নিশ্চয় সালাত অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহর স্মরণই তো সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ জানেন যা তোমরা কর।’ (সূরা আনকাবুত : ৪৫)

মুমিনের চূড়ান্ত লক্ষ্য : জীবন কোনো খেলতামাশা নয় বরং দুনিয়া আখিরাতের শস্যক্ষেত্র। রাসূল সা: বলেছেন, ‘এই দুনিয়া হলো আখিরাতের শস্যক্ষেত্র।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩২৩) একজন কৃষক উৎকৃষ্ট বীজ বপন করে কাঠফাটা রোদ আর বৃষ্টিতে ভিজে ফসলের আশা করে। কিন্তু নির্বোধ মানুষ আশা করে বীজ বপন না করে ফসল পাবার। চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো পরকালীন মুক্তি লাভ। তাই তারা জীবনের প্রত্যেকটি কাজে ভারসাম্য ও দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের কথা চিন্তা করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন তাতে তুমি আখিরাতের নিবাস অনুসন্ধান কর। তবে তুমি দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেও না। তোমার প্রতি আল্লাহ যেরূপ অনুগ্রহ করেছেন তুমিও সেরূপ অনুগ্রহ করো।’ (সূরা কাসাস : ৭৭) মুমিন দুনিয়ার জীবন নিয়ে বিচলিত হয় না আর চিন্তিতও হয় না। সুখের সময় আনন্দে আত্মহারা না হয়ে বরং আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। বিপদ যখন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে তখন ধৈর্যধারণ করে। রাসূল সা: বলেছেন, ‘মুমিনের জীবন কত চমৎকার! সুখে কৃতজ্ঞ হয় এবং বিপদে ধৈর্য ধারণ করে।’ (সহিহ মুসলিম : ২৯৯৯)

মুমিনের পরিবার ও সমাজ : ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের মূল ভিত্তি হলো পরিবার। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, হঠাৎ কোনো আগন্তুক এসে পরিবার বা সমাজে সমুদ্রের তরঙ্গবিক্ষুব্ধ সৈন্যের মতো পরিবার বা সমাজে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। যুদ্ধে পরাজিত সৈন্যের লাশ যেমন অশ্ব পদদলিত করে একইভাবে প্রযুক্তির অপব্যবহার, বিজাতীয় সংস্কৃতি ও সভ্যতা মুসলিম উম্মাহর অন্তরে লালিত সভ্যতাকে ধ্বংস করে দেয়। প্রত্যেক মুমিন পরিবার ও সমাজের অভিভাবক এবং দায়িত্বশীল। তাই তাদের উচিত, পরিবার ও সমাজে ইসলামী সংস্কৃতি ও সভ্যতা লালন এবং পরিবার ও সমাজকে সঠিকপথে পরিচালিত করার চেষ্টা করা। রাসূল সা: বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকে এক একজন রক্ষক এবং প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে।’ (সহিহ বুখারি : ৮৯৩) সমাজে প্রচলিত অন্যায়, ব্যভিচার, সুদ, সাইবার প্রতারণা, ইভটিজিং, মাদক, সন্ত্রাসসহ সব অনিয়মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে ইসলামী শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধ উন্নয়নের মাধ্যমে শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা মুসলিম উম্মাহর কর্তব্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা করো। মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ আজাব প্রদানে কঠোর।’ (সূরা মায়িদা : ২) পরিবার ও সমাজে ভারসাম্য বজায় রাখতে সত্যের বহুল প্রচলন ঘটাতে হবে। কারণ সত্য সুন্দর, সুন্দরই সত্য। রাসূল সা: বলেছেন, ‘সত্য বলো, কারণ সত্য সৎকর্মের দিকে পরিচালিত করে, আর সৎকর্ম জান্নাতে নিয়ে যায়।’ (সহিহ মুসলিম : ২৬০৭) আর ইবাদত হলো মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের প্রতীক। এজন্য ইবাদত একা আদায় নয় বরং পরিবার ও সমাজজীবনে পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠা করা। যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়।

জীবন যেমন হবে : কাছে দুনিয়া কোনো প্রমোদ ভ্রমণ নয়। কারণ তারা জানে, দুনিয়া চিরস্থায়ী আবাসভূমি বা রঙ্গমঞ্চ নয় বরং মৃত্যু সুনিশ্চিত। মৃত্যুপরবর্তী জীবনে দুনিয়ার কর্মফলের হিসেব-নিকেশ করে জান্নাত অথবা জাহান্নাম নির্ধারণ হবে। তাই তারা এ ক্ষণস্থায়ী জীবনের মোহ, আনন্দ ও উল্লাস থেকে নিজেকে মুক্ত রেখে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘প্রতিটি প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর ‘অবশ্যই কিয়ামতের দিনে তাদের প্রতিদান পরিপূর্ণভাবে দেয়া হবে। সুতরাং যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সে-ই সফলতা পাবে। আর দুনিয়ার জীবন শুধু ধোঁকার সামগ্রী।’ (সূরা আলে-ইমরান আয়াত : ১৮৫) মুমিন দুনিয়ার ক্ষণিক জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে মৃত্যুর কথা স্মরণ করে যা মানুষকে দুনিয়ার ধোঁকা আর অন্যায় থেকে বিরত রাখে। একই সাথে কুরআন ও হাদিসের আলোকে নিজেদের জীবন ঢেলে সাজানোর জন্য প্রাণান্তকর লড়াই করে নিজের কু-প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে। আর গাফিলরা দুনিয়ার স্বাদ উপভোগে মত্ত হয় এবং সম্পদ ফুরিয়ে যাওয়ার ভয়ে দান-সদকা থেকে বিরত থাকে। কিন্তু মুসলিম উম্মাহ মুসাফিরের এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের পূর্ণ সময় ও সম্পদ একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্য ব্যয় করে দুনিয়ার কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তি আর অনাবিল শান্তির পথ সুগম করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন না করে। আর যারা এরূপ করে তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত। আর আমি তোমাদের যে রিজক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করো, তোমাদের কারো মৃত্যু আসার আগে। কেননা তখন সে বলবে, হে আমার রব, যদি আপনি আমাকে আরো কিছু কাল পর্যন্ত অবকাশ দিতেন, তাহলে আমি দান-সদকা করতাম। আর সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।’ (সূরা মুনাফিকুন : ৯-১০)

মুসলিম উম্মাহর জীবনব্যবস্থা হলো কুরআন ও হাদিসের আলোকে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার নাম, যা দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ সুনিশ্চিত করে। জীবন কোনো নাটক নয় যে ইচ্ছে হলে চরিত্রের পরিবর্তন করে নতুনরূপে হাজির হবে। জীবনের প্রত্যেকটি সময় শৈশব, কৈশোর, যৌবন, বার্ধক্য একবারই আসে। তাই সঠিক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে দুনিয়া ও আখিরাতের সমন্বয় সাধন করা বড়ই শক্ত। আর দুনিয়ার মোহ মানুষকে অন্ধ আর বধির করে দেয়। যা জাহান্নামের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। আর মুসাফিরের মতো জীবন মানুষকে ধোঁকা ও প্রলোভন থেকে মুক্ত রেখে আল্লাহর আনুগত্যবোধে উদ্বুদ্ধ করে। মুসাফিরের চিন্তা অন্তরে জাগ্রত থাকলে দুনিয়া ও আখিরাতে চূড়ান্ত সফলতা অর্জন সম্ভব। হযরত ইবনে ওমর রা: বর্ণনা করেন, ‘একদিন রাসূল সা: আমার বাহুমূল শক্ত করে ধরে বললেন, দুনিয়ায় (জীবন) এমনভাবে কাটাও; যেন (দুনিয়ায়) তুমি একজন পথিক বা মুসাফির। এ কারণেই হজরত ইবনে ওমর রা: প্রায়ই বলতেন, ‘যখন তুমি সন্ধ্যায় উপনীত হবে; তখন সবার জন্য অপেক্ষা করো না। আর যখন সকাল হয়ে যায় তখন সন্ধ্যার জন্য অপেক্ষা করো না। সুস্বাস্থ্যের দিনগুলোতে রোগ-ব্যাধির জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো। আর জীবিত থাকাকালে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো।’ (বুখারি) মুসলিম উম্মাহ দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনকে প্রাধান্য দেয় না বরং কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক ব্যক্তি জীবন, পরিবার ও সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াই করে।
লেখক : প্রাবন্ধিক

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top