আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হয়ে সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বিজয়ী ভাষণে আরবি ভাষায় কথা বলেছেন আবদুল আল-সাইয়েদ। মিশিগানে নির্বাচনে জয়ের পর বুধবার ভোরে দেওয়া বক্তব্যে তিনি ‘ইনশাআল্লাহ’ ও ‘আলহামদুলিল্লাহ’র মতো আরবি শব্দ ব্যবহার করেন। তার এই বক্তব্য দ্রুত আলোচনায় আসে মার্কিন সংবাদমাধ্যমে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে হারিয়ে সিনেট নির্বাচনে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আল-সাইয়েদ। নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য রাতটি ছিল বড় ধাক্কার। একই রাতে দলটি কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারায়।
বিজয়ী ভাষণে আল-সাইয়েদ আরবি ভাষায় ‘ইনশাআল্লাহ’ বলেন, যার অর্থ ‘আল্লাহ চাইলে’। এ ছাড়া ‘আলহামদুলিল্লাহ’ শব্দটিও ব্যবহার করেন তিনি, যার অর্থ ‘সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য’। তার বক্তব্যের এই অংশ নিয়ে ফক্স নিউজের কয়েকজন উপস্থাপক ও বিশ্লেষক আলোচনা-সমালোচনা করেন।
নির্বাচনী প্রচারের সময় রিপাবলিকানদের কয়েকজন নেতা ও সমর্থক আল-সাইয়েদের সঙ্গে সন্ত্রাসী সংগঠনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলার চেষ্টা করেন। তবে এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও প্রচারের সময় তাকে ‘জিহাদি’ বলে আক্রমণ করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজয়ী ভাষণে ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে আল-সাইয়েদ বলেন, ‘ডোনাল্ড, দেখুন, আমি জানি আমার নাম উচ্চারণ করতে আপনার বেশ সমস্যা হয়েছে। তাই জানুয়ারিতে জেডি যখন আমাকে শপথ পড়াবেন, এরপর থেকে আপনি আমাকে শুধু সিনেটর বলেই ডাকতে পারেন।’
তার এই মন্তব্যে ট্রাম্পের নাম উচ্চারণ নিয়ে আগের কটাক্ষের জবাবের পাশাপাশি নিজের বিজয়ের আত্মবিশ্বাসও প্রকাশ পেয়েছে। জানুয়ারিতে নতুন সিনেটের অধিবেশন শুরু হলে দায়িত্ব নেওয়ার কথা রয়েছে আল-সাইয়েদের।
কে এই আবদুল আল-সাইয়েদ?
মিসরীয় বংশোদ্ভূত আল-সাইয়েদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে। তার বাবা মিসর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হয়েছিলেন। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি রোডস বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাবিদ্যা বিভাগ থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি নেন। চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি তিনি মহামারি বিশেষজ্ঞ হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছেন।
কর্মজীবনের শুরুতে তিনি ডেট্রয়েট শহরের স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব নেন। ২০১৫ সালে শহরটির স্বাস্থ্য বিভাগ পুনর্গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। পরে ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ওয়েইন কাউন্টির স্বাস্থ্য, মানবসেবা ও ভেটেরানবিষয়ক বিভাগের পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। জনস্বাস্থ্য খাতে তাঁর অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে প্রবেশের পথ তৈরি করে।
২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন চেয়েছিলেন আল-সাইয়েদ। তবে সে নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি। ২০২৬ সালে তিনি মিশিগানের সিনেট আসনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান। দলীয় প্রাথমিক নির্বাচনে কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেনসকে পরাজিত করে আলোচনায় আসেন তিনি। এরপর সাধারণ নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হন সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্স।
নির্বাচনী প্রচারে স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেন আল-সাইয়েদ। সবার জন্য সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, চিকিৎসা-সংক্রান্ত ঋণের বোঝা কমানো এবং রাজনীতিতে ধনকুবের ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রভাব নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। তার মতে, স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, বরং মানুষের মৌলিক অধিকার।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও তার অবস্থান ছিল আলোচিত। গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা বন্ধের দাবি জানান তিনি। তার বক্তব্য, মার্কিন করদাতাদের অর্থ দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে ব্যয় হওয়া উচিত, অন্য দেশের শিশুদের ওপর বোমা ফেলতে নয়। এ অবস্থানের কারণে নির্বাচনী প্রচারে তাকে নানা রাজনৈতিক আক্রমণের মুখেও পড়তে হয়।
জয়ের দাবি করে দেওয়া ভাষণেও করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও ধনকুবেরদের প্রভাবের বিরুদ্ধে কথা বলেন আল-সাইয়েদ। তিনি বলেন, বিশেষ স্বার্থগোষ্ঠীগুলো নিজেদের সুবিধামতো ব্যবস্থাকে সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে তাদের প্রভাব মোকাবিলা করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও শক্তিশালী দেশে মানুষের জন্য খাবার কেনা, বাড়ি করা কিংবা চিকিৎসকের কাছে যাওয়া এত কঠিন হওয়ার কথা নয়।
মিশিগানের এই জয়ের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে নতুন ইতিহাস তৈরি হলো। আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে তাকে দেশটির ইতিহাসে প্রথম নির্বাচিত মুসলিম সিনেটর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আগামী জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হলে সিনেট সদস্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার কথা তার।




