বরিশাল জার্নাল ডেস্ক
ধান-নদী-খাল, এই তিন মিলে হয় বরিশাল। তবে এখন ধানের পাশাপাশি পান চাষে আগ্রহী বরিশাল জেলার কৃষকরা।
স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে বরিশালের পান। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত ‘বারি পান-১’ ও ‘বারি পান-২’ জাতের সফল চাষ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বাড়ায় অল্প পুঁজিতে পান চাষ করে লাভবান হচ্ছেন এ অঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকেরা।
বরিশাল অঞ্চলের মাটি পান চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে পান চাষ হয়ে আসছে। একবার বরজ তৈরি করে নিয়মিত পরিচর্যা করলে টানা ৬ থেকে ৭ বছর পান উৎপাদন করা যায়। তুলনামূলক কম খরচে দীর্ঘদিন ফলন পাওয়ায় কৃষকদের কাছে পান চাষ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পান রপ্তানি হওয়ায় কৃষকদের আগ্রহ আরও বেড়েছে। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি বিদেশের বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় অনেক কৃষক নতুন করে পান চাষে যুক্ত হচ্ছেন।
বরিশালের গৌরনদী উপজেলার টরকী এলাকার পানচাষি লতিফ মিয়া বলেন, শুরুতে মাত্র ৬ শতাংশ জমিতে পান চাষ করেছিলেন। সেখানে ভালো ফলন ও লাভ পাওয়ার পর এখন তিনি আরও বড় পরিসরে পান চাষের পরিকল্পনা করছেন। নতুন জমি লিজ নিয়ে ‘বারি পান-১’ ও ‘বারি পান-২’ জাতের পান চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।
একই এলাকার পানচাষি খোকন মুন্সি বলেন, অন্য কৃষকের পান চাষ দেখে তিনিও এ কাজে যুক্ত হয়েছেন। একবার বরজ তৈরি করলে দীর্ঘদিন পান উৎপাদন করা যায়। এতে প্রতিবছরই লাভের পরিমাণ বাড়ছে। তার উৎপাদিত পান দেশের বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
বরিশাল আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের গবেষকেরা বলছেন, ‘বারি পান-১’ ও ‘বারি পান-২’ জাতের বৈশিষ্ট্যের কারণে তুলনামূলক কম জমিতে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। পাশাপাশি এসব জাতের পান সহজে নষ্ট হয় না। ফলে দূরবর্তী বাজারে সরবরাহ এবং বিদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে কৃষকেরা সুবিধা পাচ্ছেন।
বরিশাল আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মাহমুদুল হাসান খান বলেন, একসময় পান মূলত দেশের বাজারের চাহিদা পূরণের জন্যই উৎপাদন করা হতো। বর্তমানে দেশের বাইরেও এর চাহিদা তৈরি হয়েছে। নতুন কৃষকেরা কম খরচে পতিত জমিতেও পান চাষ শুরু করতে পারেন।
তিনি বলেন, পান চাষে অতিরিক্ত রাসায়নিক বা জৈব সারের প্রয়োজন হয় না। সরিষার তেল ভাঙানোর খৈল জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করেই ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বরিশালের পান রপ্তানি হচ্ছে। পান শুধু খাদ্য হিসেবে নয়, বিভিন্ন ঔষধি কাজেও ব্যবহৃত হওয়ায় এর চাহিদা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ‘বারি পান-১’ ও ‘বারি পান-২’ জাতের পান চাষ করে প্রতি হেক্টরে প্রায় ২৮ লাখ পানপাতা উৎপাদন করা সম্ভব। এ কারণে তরুণ উদ্যোক্তাদের পান চাষে আগ্রহী করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষকদের আধুনিক পদ্ধতিতে পান চাষের জন্য প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বরিশাল আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আনোয়ারুল মোনিম বলেন, বর্তমানে প্রায় ২ হাজার পানচাষি ‘বারি পান-১’ ও ‘বারি পান-২’ জাতের পান চাষ করছেন। ভবিষ্যতে আরও প্রায় ৫ হাজার কৃষককে পান চাষের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বরিশালের পানের চাহিদা আরও বাড়ানো গেলে এ অঞ্চলের কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে। এতে একদিকে যেমন প্রান্তিক কৃষকদের আয় বাড়বে, অন্যদিকে রপ্তানি আয়ের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বরিশালের পান।
আগামীর সময়




