হেরেও জয়ী কেপ ভার্দে

এম. এম. কায়সার

মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে শেষ বাঁশি বাজতেই নীল জার্সির ফুটবলাররা কেউ হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন, কেউ মুখ ঢাকলেন দুই হাতে। চোখের জল থামানোর চেষ্টা করেও পারলেন না। তবে সব চোখের জল শুধু কান্না নয়, অদম্য সাহস এবং গর্বের গল্প গাথাও আছে এই জলে!

বিশ্বকাপের এই ম্যাচের ফলাফল জানাচ্ছে, কেপ ভার্দে হেরেছে। কিন্তু ফুটবল কি শুধু স্কোর লাইনের গল্প?
এই ম্যাচ শেষে বিশ্বকাপের মঞ্চে আরেকটি সত্য জন্ম নিল- সব পরাজয় পরাজয় নয়।
কেপ ভার্দে বিদায় নিয়েছে। কিন্তু ম্যাচ শেষে মনে হলো বিশ্বকাপ যেন তাদের বিদায় জানাতে রাজি নয়। ছোট্ট দ্বীপদেশটি প্রমাণ করে গেছে, ফুটবলে অসম্ভব বলে সত্যিই কিছু নেই!

মাত্র পাঁচ লাখ মানুষের একটি দেশ। বিশ্বকাপ শুরুর আগে ফিফা র‌্যাঙ্কিং ৬৭। ইতিহাস, অর্থ, তারকা কিংবা পরিকাঠামো, পেছনের পরিসংখ্যান-কোনো দিক থেকেই আর্জেন্টিনার ধারেকাছেও নয়। কিন্তু ১২০ মিনিট শেষে এই দলটিই মাথা উঁচু করে মাঠ ছেড়েছে, তারা দেখিয়ে গেছে সাহসের নিজস্ব একটা ভাষা আছে।

ম্যাচ শুরুর বাঁশি বাজতে তাদের পরিকল্পনা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছিল। নিজেদের অর্ধে ঘন রক্ষণ, হাইলাইন ডিফেন্স করে মাঝমাঠে দূরত্ব কমিয়ে রাখা, মেসির জন্য আলাদা নজরদারি, আর সুযোগ পেলেই দ্রুত পাল্টা আক্রমণ। আর্জেন্টিনার প্রতিটি আক্রমণের সামনে যেন নীল দেয়াল উঠে দাঁড়াচ্ছিল কেপ ভার্দের ওটা একাদশ। একবার একজন, পরক্ষণেই আরেকজন। একজনের ভুল আরেকজন ঢেকে দিচ্ছিল। যেন এগারোজন নয়, পুরো একটি জাতি রক্ষণে নেমেছে।

আর সেই দেয়ালের শেষ প্রহরী ছিলেন গোলকিপার ভোজিনিয়া। ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক আবারও মনে করিয়ে দিলেন, অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প নেই। একের পর এক সেভে তিনি আর্জেন্টিনাকে হতাশ করেছেন। স্পেনের বিপক্ষে যেমন করেছিলেন, তেমনি এবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বারবার থামিয়ে দিয়েছেন। তার গ্লাভস যেন বারবার বলছিল—”এত সহজে নয়, এই চত্বর টপকানো।”
তবু বিপক্ষে যখন লিওনেল মেসি, তখন কখনও কখনও পরিকল্পনারও সীমা থাকে। অসাধারণ এক ফিনিশে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন মেসি। ম্যাচের বয়স তখন ২৯ মিনিট। এমন মুহূর্তে অন্য কোন নবীন দল হয়তো তখন ভেঙে পড়ত। কেপ ভার্দে পড়েনি।
তারা ফিরে এসেছে একবার নয়, দুবার। তাও দারুণ দাপুটে ভঙ্গিতে।

মেসির গোলের পর সমতা ফিরিয়েছে। অতিরিক্ত সময়ে আবার পিছিয়ে পড়েও হার মানেনি। কাবরালের দুর্দান্ত গোল আবারও তাদের ফিরিয়ে এনেছে ম্যাচে। কোন প্রশ্ন ছাড়া যে কেউ বলবে কাবরালের এই গোলটা চলতি বিশ্বকাপের সেরা গোল। যে দুরূহ অ্যাঙ্গেল থেকে গোল করলেন, এমন কায়দায় গোল করাটা কেবল স্বপ্নেই চিন্তা করা যায়!

ম্যাচের প্রতিটি সমতাসূচক গোলের সঙ্গে যেন পুরো ফুটবল বিশ্ব উঠে দাঁড়িয়েছে এই ক্ষুদ্র দেশের পাশে।
শেষ পর্যন্ত ভাগ্য তাদের সঙ্গ দেয়নি। ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর হেড ডিনেই বোর্জেসের গায়ে লেগে দিক বদলে জালে ঢুকে যায়। আত্মঘাতী সেই মুহূর্তই শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের রূপকথার সমাপ্তি লিখে দেয়।
কিন্তু সত্যিই কি সমাপ্তি?

বিশ্বকাপে স্পেনকে গোলশূন্য আটকে রাখা, আর্জেন্টিনাকে ১২০ মিনিট খেলতে বাধ্য করা, দুবার পিছিয়ে থেকেও ফিরে আসা, আর শেষ পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের কাঁপিয়ে দেওয়া-এসব কোনো ছোট দেশের গল্প নয়। এগুলো বড় সাহসের গল্প।
স্কটল্যান্ডের সাবেক ফুটবলার জেমস ম্যাকফ্যাডেন ঠিকই বলেছেন, “কেপ ভার্দে হেরেছে, কিন্তু জিতেছে। তারা সাহস, ঐক্য আর নিজেদের ওপর অবিচল বিশ্বাসের এক অসাধারণ উদাহরণ রেখে গেছে। এই বিশ্বকাপের গল্প যদি একটি দলকে নিয়ে লেখা হয়, তবে সেটি কেপ ভার্দে।”

ইংল্যান্ডের সাবেক তারকা গ্যারি নেভিলের চোখেও এটি ছিল ” কোন আন্ডারডগের সেরা পারফরম্যান্সগুলোর একটি।”
হয়তো কয়েক দিন পর মানুষ মনে রাখবে, আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল।
কিন্তু বহু বছর পরও মানুষ আরও একটি গল্প বলবে-একটি ছোট্ট দ্বীপদেশের কথা, যারা বিশ্বের সেরা দলের সামনে মাথা নত করেনি।
তারা আর্জেন্টিনাকে হারাতে পারেনি। ট্রফি জেতেনি, কিন্তু মানুষের হৃদয় জিতেছে।
যারা বিশ্বকাপ মঞ্চ থেকে বিদায় নিয়েছে কিন্তু ফুটবলের ইতিহাসে নিজেদের জন্য স্থায়ী একটি ঠিকানা বানিয়ে গেছে।
ধন্যবাদ, কেপ ভার্দে।

তোমরা বিদায় নিয়েছ, কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয় থেকে কখনও বিদায় নেবে না।
সুপার্ব শো!

আমার দেশ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top