ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত পিরোজপুর শিশু পরিবারের এতিম শিশুরা

বরিশাল জার্নাল ডেস্ক

ঈদ মানেই আনন্দ, উৎসব আর পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সুখের মুহূর্ত ভাগাভাগি করে নেওয়ার সময়। নতুন পোশাক, সুস্বাদু খাবার আর প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে কাটে অধিকাংশ মানুষের ঈদ। তবে এই আনন্দের চিত্রের বাইরে রয়েছে পিরোজপুর সরকারি শিশু পরিবারের এতিম ও অসহায় শিশুরা। বাবা-মায়ের স্নেহ-ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত এসব শিশুর জীবনে ঈদের আনন্দ যেন অনেকটাই ফিকে।

পিরোজপুর সরকারি শিশু পরিবারে বর্তমানে ৪৫ জন এতিম ও অসহায় শিশু আশ্রয় নিয়ে বেড়ে উঠছে। কেউ জন্মের পরই হারিয়েছে বাবা-মাকে, আবার কেউ পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার কারণে এখানে ঠাঁই পেয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানই এখন তাদের থাকা, খাওয়া, পড়াশোনা ও বেড়ে ওঠার একমাত্র ঠিকানা।

ঈদ উপলক্ষে নতুন পোশাক ও বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করা হলেও পরিবারকে ঘিরে আনন্দ কিংবা কোথাও ঘুরতে যাওয়ার সুযোগ নেই তাদের। বছরের অন্যান্য দিনের মতো ঈদের সময়ও নির্ধারিত নিয়মকানুনের মধ্যেই কাটে তাদের জীবন। বাইরে যখন মানুষ পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দে মেতে ওঠে, তখন শিশু পরিবারের শিশুরা নীরবে তাকিয়ে থাকে চার দেয়ালের বাইরের পৃথিবীর দিকে।

শিশু পরিবারের একাধিক শিশু জানায়, নতুন পোশাক ও ভালো খাবার পেলেও ঈদের দিনে বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের অভাব তাদের সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। অন্যদের পরিবার নিয়ে আনন্দ করতে দেখে তাদেরও ইচ্ছা জাগে আপনজনদের সঙ্গে সময় কাটানোর।

শিশু ফারজানা বলেন, অনেকে মা-বাবার সঙ্গে ঈদ কাটায় কিন্তু আমার বাবা মাছ ধরতে গিয়ে মারা গেছে। এখানে মন খারাপের মাঝেও ঈদ কাটাতে মোটামুটি ভালো লাগে। মা-বাবার সঙ্গে ঈদ কাটাতে পারি না তাই মন খারাপ হয়।

কারিমা নামে এক শিশু বলেন, আমার বাবা স্টক (স্ট্রোক) করে মারা গিয়েছে। তাই এখানে এসেছি, যখন দেখি অন্যরা তাদের মা-বাবার সঙ্গে ঘুরতে যায় তখন খুব খারাপ লাগে। আমার মায়ের কথা পড়ার সময় মনে পড়ে, বশে থাকলে মনে পড়ে। মন খারাপ হলে একটু খেলাধুলা করি।

ফাতিমা নামে আরেক শিশু বলেন, আমার বাবা খোঁজ নেয় না এবং মা অন্যের বাসায় কাজ করে। এজন্য এখানে আমাকে দিয়েছে। মা-বাবার সঙ্গে ঈদ কাটাতে পারি না, তার জন্য খুব মন খারাপ হয়।

লামিয়া আক্তার বলেন, আমি প্রায় ৮ বছর এখানে আছি। এখানে নতুন জামাকাপড় দেয়, মাঝে মধ্যে অনুষ্ঠান হয়। প্রথম আসার পরে কিছুটা কষ্ট পেয়েছি। যখন বাহিরের স্কুলে দেখি বাচ্চাদের মা-বাবা আসে ওদের সঙ্গে কথা বলে তখন আমার মা-বাবার কথা মনে পারে।

সুরাইয়া আক্তার নামে আরেকজন ছাত্রী বলেন, আমি এখানে প্রায় ১১ বছর ধরে আছি। বাবা মারা যাওয়ার পর এখানে এসেছি। আমরা তিন বোন, বড়ো বনের বিবাহ হয়েছে, আর ছোট বোন মায়ের কাছে থাকে। আমাদের পরিবারে অনেক কষ্ট এজন্য এখানে দেওয়া হয়েছে। এখানে অনেক মেয়েরা আছে এজন্য কিছুটা ভালো লাগে। এখন তো ঈদ কিন্তু সবার কথা মনে পড়ে, কি করার আল্লাহ আমাদের কপালে তো এটাই লিখেছেন।

একাদশ শ্রেণির ছাত্রী তাসলিমা আক্তার বলেন, আমি যখন ছোট ছিলাম তখন বাবা মারা গিয়েছে। আমি অনেক ছোট সময় এখানে এসেছি। এখানে আমি প্রায় ১০ বছর আছি। প্রতিবছর এখানে ঈদ করা হয়। এখানে ভালো খাবার দেওয়া হয়, নতুন জামা দেওয়া হয়। ছোট বেলায় যখন আসছিলাম তখন মা-বাবাকে ছেড়ে থাকতে খুব খারাপ লাগতো।

পিরোজপুর সরকারি শিশু পরিবারের উপ-তত্ত্বাবধায়ক শাবানা খানম বলেন, শিশু পরিবারে যেসব শিশুরা থাকে তারা বেশিরভাগ এতিম এবং দুস্থ শিশুরাও আছে। আসলে বাবা মায়ের জায়গাটা তো পুরন করা সম্ভব না, কারো পক্ষে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করি ওদেরকে ভালো রাখতে। আমাদের শিশু পরিবারে যারা সদস্যরা আছে কেউ ছুটি নেই না, আমরা ওদের সাথে কাটাই। ওরা ঈদের দিন গোসল করে, একসাথে খাবার খায়, গরু জবাই করার সময় সবাই মিলে উপভোগ করে, রান্না করে এবং একসাথে ঘোরাফেরা করে। এভাবেই ওদের সারাদিনটা কেটে যায়।

এশিয়া পোস্ট

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top