বিশ্ব তাকিয়ে ইসলামাবাদে

বরিশাল জার্নাল ডেস্ক

৪০ দিনের ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের পর আলোচনায় বসেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে গতকাল বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যায় শুরু হয় বহুল প্রতীক্ষিত ‘ইসলামাবাদ টকস’। ৬ ঘণ্টা ধরে চলা এ বৈঠক শেষে লিখিত বার্তা বিনিময় করেছে উভয় পক্ষ। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এ আলোচনা নিয়ে অনেক সংশয় ও অনাস্থা থাকলেও পুরো বিশ্বের দৃষ্টি এখন এ বৈঠকের দিকে।

বিশ্বের অর্থনীতিকে বড় ধাক্কা দেওয়া যুদ্ধের সমাপ্তি চায় সবাই। তাই আলোচনার ফল কী হয় তা নিয়ে সবার আগ্রহ। 

পাকিস্তানের ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে মধ্যস্থতা করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, সেনাপ্রধান আসিম মুনির, উপ-প্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার ও নিরাপত্তা উপদেষ্টা আসিম মালিক। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।

তার সঙ্গে আছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ ইউটকফ ও মার্কিন সামরিক বাহিনীর মধ্যপ্রাচ্যের কমান্ডার ব্রাড কুপার। অন্যদিকে বিশ্ব তাকিয়ে ইসলামাবাদেইরানের প্রতিনিধি দলে রয়েছেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজেদ তাখত রাভাঞ্চি ও জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সেক্রেটারি বাঘের জোলঘাদর। ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকের প্রথম পর্যায়ে মুখোমুখি আলোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধি দল। এরপর উভয়পক্ষ অর্থনৈতিক, সামরিক, আইনি ও পারমাণবিক ইস্যুতে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের আলোচনা করে।
আলোচনা শেষে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞ দলগুলো লিখিত পত্র বিনিময় করেছে। ইরান সরকার এক এক্স পোস্টে জানিয়েছে, অর্থনৈতিক, সামরিক, আইনি এবং পারমাণবিক কমিটিগুলোর অংশগ্রহণে আলোচনাটি ‘বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর আগে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, দেশের স্বার্থ রক্ষায় ইরানের প্রতিনিধি দল পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে। প্রতিনিধি দলটি সাহসিকতার সঙ্গে আলোচনা করবে। আলোচনার ফলাফল যাই হোক না কেন, সরকার তার জনগণের পাশে থাকবে।
এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা আজ রবিবারও চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান। কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের পক্ষ থেকে একটি প্রচেষ্টা চলছে যাতে, এ আলোচনা আরও এক দিন চালিয়ে যায় দুই পক্ষ। এতে এমন কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে যা দুই পক্ষকে চুক্তির দিকে নিয়ে যেতে পারে। প্রথম দফার আলোচনায় দুই পক্ষ সেই পর্যায়ে পৌঁছেনি।

গতকাল দুপুরের পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দল। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মূল বৈঠকে বসার আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় অংশ নেয় মার্কিন প্রতিনিধি দল। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলে ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ইরানের প্রতিনিধি দলের বৈঠকে অংশ নেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, পৃথক বৈঠকে পাকিস্তানের পক্ষে আরও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি। তবে বৈঠকের আলোচনা নিয়ে কোনো পক্ষই বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। এক বিবৃতিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আশা প্রকাশ করেন, এ আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে একটি বড় ধাপ হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে দুই পক্ষকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা দিতে পাকিস্তানের অঙ্গীকারের কথা তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।

‘ইসলামাবাদ টকস’ ঘিরে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ কার্যত ‘লকডাউন’-এর মধ্যে রয়েছে। শহরজুড়ে নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন নিন্ডিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা। রাজধানীতে মোতায়েন রয়েছে প্রায় ১০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী। এর মধ্যে পুলিশ, সামরিক বাহিনী এবং বিশেষ সেবা কমান্ডো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পুরো নিরাপত্তাব্যবস্থা বহুস্তরভিত্তিকভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে যে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। নিরাপত্তার স্বার্থে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ‘রেড জোন’ সম্পূর্ণরূপে অবরুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যেখানে সরকারি স্থাপনাগুলো অবস্থিত, সে এলাকায় প্রবেশের সব সড়ক বন্ধ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে শহরের বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্ল্যান বি নেই, ডোনাল্ড ট্রাম্প : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হলে ওয়াশিংটনের কোনো বিকল্প পরিকল্পনা (প্ল্যান বি) নেই। গতকাল ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো ব্যাকআপ প্ল্যানের দরকার নেই। তাদের সামরিক শক্তি ভেঙে পড়েছে। আমরা সবকিছু একীভূত করেছি। তাদের খুব অল্প ক্ষেপণাস্ত্র আছে, উৎপাদন সক্ষমতাও সীমিত। আমরা তাদের ওপর কঠোর আঘাত হেনেছি। আমাদের সেনাবাহিনী অসাধারণ কাজ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ‘পুরোপুরি অবিশ্বাস’ নিয়ে আলোচনায় বসছে ইরান, আব্বাস আরাঘচি : যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি পুরোপুরি অবিশ্বাস নিয়ে ইরান আলোচনায় বসছে বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। গতকাল বৈঠকের আগে জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়েডফুলের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। আব্বাস আরাঘচি বলেন, ইরান তার দেশের জনগণের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় পুরো শক্তি দিয়ে লড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসার আগে তিনি ওয়াশিংটনের অতীতের নানা কর্মকাণ্ডকে ‘প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ’ ও ‘কূটনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

ইরানি প্রতিনিধি দলের বিমানে ‘মিনাব স্কুল হামলা’য় নিহতদের ছবি ও ব্যবহৃত সামগ্রী : ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছে। গতকাল আলোচনার উদ্দেশে রওনা হওয়ার সময় বিমান থেকে একটি ছবি শেয়ার করেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মুহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। সমাজমাধ্যমে দেওয়া ওই ছবিতে দেখা গেছে, বিমানে গালিবাফের চারপাশের ফাঁকা আসনগুলোতে সাজানো রয়েছে বেশ কিছু শিশুর ছবি। মিনাবে একটি স্কুলে মার্কিন মিসাইল হামলায় প্রাণ হারিয়েছিল ওই শিশুরা। ছবিটির ক্যাপশনে গালিবাফ লিখেছেন, এই ফ্লাইটে আমার সফরসঙ্গীরা।

ছবিতে আরও দেখা গেছে, বিমানের ফাঁকা আসনগুলোতে মিনাব স্কুল হামলায় নিহতদের ছবির পাশাপাশি তাদের জিনিসপত্রও রাখা হয়েছে। ‘মিনাব ১৬৮’ নামের এ বিমান সাজানো হয়েছে ওই মার্কিন হামলায় নিহত ১৬৮ জনের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। হামলায় নিহতদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিল শিশু। ওয়াশিংটন প্রথমে এ হামলার দায় অস্বীকার করলেও বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, মার্কিন মিসাইলই মিনাবের স্কুলটিতে আঘাত হেনেছিল।

বেরিয়ে আসছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ক্ষয়ক্ষতির চিত্র : যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ায় একে বেরিয়ে আসছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। গতকাল কাতারের রাস লাফান শিল্পনগরীতে গ্যাস রপ্তানি কেন্দ্রে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, হামলার পরপরই কারখানায় আগুন ধরে যায়। হামলা তীব্রতায় আশপাশের ভবনগুলো কেঁপে ওঠে। পুরো এলাকা আগুনের লাল আভায় ভরে যায়।

কাতার এনার্জি জানিয়েছে, বিশ্বের বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানি কেন্দ্রের অংশ এ স্থাপনাটি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। হামলার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু অংশ মেরামত করতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে। বাংলাদেশ প্রতিদিন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top